দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্য ডাল। ছয় মাসে বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫-২৫ টাকা। ক্রাশিং মিলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন খরচের চাপে পণ্যটির দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আবার এ সুযোগে মজুদ ও আমদানি সংকটকে পুঁজি করেও ডালের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
ছয় মাস ধরে দাম বাড়ার প্রবণতা থাকলেও জ্বলানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচের চাপে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এ সময় বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম কেজিতে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যে দেখা যায়, ছয় মাসে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের চাহিদার বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম বেশ বেড়েছে। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল মসুরের (মোটা) দাম ছিল ৮৫-১০০, মুগ (মোটা) ১২০-১৩০, মটর ৫০-৬০ ও ছোলার দাম ছিল ৮০-৯০ টাকা। অন্যদিকে চলতি মাসের ৯ তারিখে মসুরের (মোটা) দাম ছিল ৯০-১০৫ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বেড়েছে ৫ টাকা। মুগের (মোটা) দাম ছিল ১৩০-১৫০ টাকা, বেড়েছে ১০-২০ টাকা, মটরের দাম ছিল ৭০-৮০ টাকা, বেড়েছে ১৫-২০ টাকা এবং ছোলার দাম ছিল ১০০-১১৫ টাকা, অর্থাৎ ছয় মাসে বেড়েছে ২৫ টাকা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল প্রতি কেজি মোটা মসুর বিক্রি হয়েছে ৮১-৮২ টাকায়, চিকন মসুর ১২০-১৬০, চিকন মুগ ১৫৩-১৫৮, মোটা মুগ ১৩০-১৩৫, মটর ৫৭-৫৮ ও ছোলা ১০০-১০৭ টাকায়। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত মুগ ও ছোলার দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
পাইকারি ও খুচরা বাজার সূত্রে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে দেশের বাজারে ডালের চাহিদা বেশি থাকে। বিশেষ করে সবজির দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিত্য আহারে ডালের প্রচলন বেশি থাকে। এ চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি চলতি বছর কয়েক দফায় বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্রাশিং মিলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে পরিবহন খরচও। সার্বিকভাবে ডালের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া জরুরি নিত্যপণ্য হিসেবে ডাল আমদানিতে শুল্ক না থাকলেও দেশের মধ্যে সংকট দেখিয়ে আমদানিকারক ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়িয়ে ডাল বিক্রি করছে বলে অভিযোগ খাতসংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডাল রফতানিকারক দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো সংকট নেই, বরং সম্প্রতি ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলা, আমদানিতে অগ্রিম আয়করসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে সরকার। এর পরও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে মুদ্রাস্ফীতির চাপের প্রভাবকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পাইকারি বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ এপ্রিল মোটা মুগডালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা। ৮ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৮-১৩২ টাকায়। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ৪২-৪৩ টাকা। একই সময়ে অ্যাঙ্কর বা মটর ডালের পাইকারি দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত ৯ এপ্রিল এ ডালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৩৮-৪০ টাকা। ৮ অক্টোবর তা বেড়ে হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা মুগ ১৫০ ও মটর কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ছোলার দাম। রমজান সামনে রেখে আগাম মজুদপ্রবণতায় ধারাবাহিকভাবে দাম বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছয় মাস আগে প্রতি কেজি ছোলার পাইকারি বাজারমূল্য ছিল ৭০-৭৪ টাকা। ৮ অক্টোবর পাইকারিতে ছোলা লেনদেন হয়েছে ৯৪-১০০ টাকায়। গতকাল তা আরো বেড়ে সর্বোচ্চ ১০৫ টাকায় লেনদেন হয়েছে। পাইকারিতে মূল্যবৃদ্ধিতে খুচরায় ৮০-৯০ থেকে বেড়ে ১০০-১১৫ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। রমজান ছাড়া সারা বছরই দেশব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্যপণ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছোলার চাহিদা থাকে।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান মেসার্স পায়েল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আশুতোষ মহাজন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডালের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানিকারক ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো হাত নেই। জ্বালানির পাশাপাশি পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ক্রাশিং ও আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে ডালের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। দীর্ঘদিন মটরসহ বিভিন্ন ডালের দাম নিম্নমুখী থাকায় অনেক আমদানিকারকই লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করেছেন। এখন সরবরাহ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে ডালের দর নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রায় সব ধরনের ডালই উৎপাদন হয়। তবে দেশীয় চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সেসব আমদানি করতে হয়। রফতানিকারক দেশগুলোর উৎপাদন মৌসুমের আবহাওয়া ও ফলনের ওপর নির্ভর করে বুকিং মার্কেটে ডালের দাম ওঠানামা করে। সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক উৎপাদন স্থিতিশীল থাকায় দেশের বাজারেও দাম স্থিতিশীল ছিল। দেশীয় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ মজুরি বৃদ্ধিজনিত কারণে ডালের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আজিজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ডাল আমদানিতে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত। ফলে উৎপাদন মৌসুমে ডাল আমদানির পর মজুদ ও সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটলে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে যায়। বর্তমানে দেশে ডালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও কোনো কারণ ছাড়াই মটর, মুগ ও ছোলার ডালের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।’ ডালের মূল্যবৃদ্ধির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রমজান সামনে রেখে তা আরো অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাল দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় তুলনামূলক কম খরচে প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মাছ-মাংসের মতো প্রাণিজ আমিষের দাম বেশি থাকলে অনেক পরিবার মুগ, মসুর ও মটর ডালের ওপর নির্ভর করে। সে কারণে মোটা মুগ ও মটর ডালের মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী পণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় সরাসরি বাড়ে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের দাম বাড়লে খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ডালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি আমদানি ও স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে সব ধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। শাক-সবজি, মাছ-মাংসের মূল্যবৃদ্ধি ডালের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের। এখন ডালের দামও ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এজন্য আমদানি, ক্রাশিং, সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনাসহ সব ক্ষেত্রে তদারকির মাধ্যমে ডালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের নজর দেয়া উচিত।’










