নগরবাসীর অভিযোগ, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। নামমাত্র ফগিং, নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে। এদিকে গত সপ্তাহে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ২০১ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৬৪ জন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৯ জনকে অন্যত্র রেফার করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ৯২ জন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিদিনই ডেঙ্গুর নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় চাপ বাড়ছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে মোট ৫২২ জন পরীক্ষা করায়। তাদের মধ্যে ৮৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ২২৩ জন পরীক্ষা করিয়ে ৩৬ জন ও বেসরকারি হাসপাতালে ২৯৯ জন পরীক্ষা করিয়ে ৪৮ জন ডেঙ্গু পজিটিভ হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গাজীপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি মহানগরীর টঙ্গী এলাকায়। পাশাপাশি কড্ডা, কোনাবাড়ী, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর এলাকায়ও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
জেলার প্রধান হাসপাতাল শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। গত শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭৩ ডেঙ্গু রোগী। পরদিন এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭-তে। একদিনের ব্যবধানে গতকাল তা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ জনে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মেডিসিন বিভাগে ৪৮টি ও শিশু বিভাগে আটটি শয্যা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এসব শয্যার তুলনায় বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
এদিকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে শয্যা পাওয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন রোগী ও স্বজনের দাবি, দালাল বা হাসপাতালের কিছু কর্মীর মাধ্যমে টাকা দিলে কাঙ্ক্ষিত শয্যা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যেও সচেতনতার ঘাটতি দেখা গেছে। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক রোগী মশারি ব্যবহার না করেই বিছানায় অবস্থান করছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে তারও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) ডা. শেখ কামরুল করিম বলেন, ‘অন্যান্য বছর জুন-জুলাইয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা গেলেও এবার একটু দেরিতে আগস্টে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা স্পেসিফিক ম্যানেজমেন্ট নেই। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লুইড, নরমাল স্যালাইন, খাবার স্যালাইন ও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেয়া হচ্ছে।’ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় স্যালাইন, ওষুধ ও মশারির প্রয়োজনীয় সরবরাহ রয়েছে বলেও জানান তিনি। ডা. কামরুল করিম বলেন, ‘ডেঙ্গুর চিকিৎসার চেয়ে বড় কথা হলো ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা। যে রোগীর ডেঙ্গু হয়েছে, তার কাছ থেকে যেন আর কারো ডেঙ্গু না হয়। এজন্য ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে থাকতে বলা হয়।’
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় মশক নিধনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি অর্থবছরে মশক নিধনের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে এ অর্থ বরাদ্দ থাকলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলাদা কোনো বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হয়নি বলে স্বীকার করেছে সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে মশক নিধনের জন্য ১০ কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছে। মশক নিধনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নালা পরিষ্কার, কীটনাশক ছিটানো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
তবে নগরবাসীর অভিযোগ, ডেঙ্গুর প্রকোপের তুলনায় এসব কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকা, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন ও ময়লা-আবর্জনার কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। অনেক এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের।
মহানগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোশারফ হোসেন জানান, তিনি ও তার স্ত্রী দুজনই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার অভিযোগ, এ বছর এলাকায় মশক নিধনের জন্য কোনো ওষুধ ছিটানো হয়নি। ফলে মশার উপদ্রব বেড়ে ডেঙ্গুও ছড়িয়ে পড়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গাতেই মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় তা বাড়ছে, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমার জানা মতে, গাজীপুরে এটি এখনো প্রকট আকার ধারণ করেনি। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কেউ মারা গেছে এমন তথ্যও নেই। আমরা এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।’










