পরিবহন ও যোগাযোগ খাতকে গুরুত্ব দিয়ে গত এক দশকে বিপুল বিনিয়োগ করেছে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে খাতটিতে। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নে শেষ পাঁচ বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা। ধারাবাহিক বড় বিনিয়োগের ফলও আসতে শুরু করেছে। ২০১৫ সালে যেখানে দেশের ৪৩ ভাগ সড়ক ভাঙাচোরা ছিল, সেখানে বর্তমানে ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ ১৯ শতাংশ। যদিও নিম্নমানের নির্মাণকাজ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি, বাস্তবায়নে অদক্ষতা, ভুল পরিকল্পনাসহ নানা কারণে দেশের সড়ক অবকাঠামোর টেকসইযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
দেশের সড়কগুলো কী দশায় আছে, তা জানতে প্রতি বছর জরিপ চালায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ (এইচডিএম)। গাড়িতে যন্ত্র বসিয়ে নিরূপণ করা হয় সড়কের বাস্তব অবস্থা। সড়ক ঠিক করতে কত টাকা লাগবে, তা-ও নির্ধারণ করা হয় এ প্রক্রিয়ায়। এবার গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জরিপটি পরিচালনা করে এইচডিএম। অধিদপ্তরের আওতাধীন ২২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ২৮২ কিলোমিটার সড়কে জরিপ করা হয়েছে। এতে ‘খুব খারাপ’, ‘খারাপ’ ও ‘দুর্বল’ সড়ক পাওয়া গেছে ৩ হাজার ৫৯০ কিলোমিটার। এইচডিএমের হিসাবে ভাঙাচোরা দশায় রয়েছে সওজ অধিদপ্তরের ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ সড়ক।
ভাঙাচোরা এসব সড়ক ঠিক করতে ১৪ হাজার ৬২২ কোটি টাকা দরকার হবে বলে এইচডিএমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৭২৭ কোটি, পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি, আংশিক পুনর্নির্মাণের জন্য ৩ হাজার ২৭৭ কোটি ও পুনর্নির্মাণের জন্য আরো ৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা দরকার হবে। যদিও সওজ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে যে পরিমাণ বরাদ্দের প্রয়োজন হয়, বাস্তবে রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বরাদ্দ দেয়া হয় অনেক কম। সর্বশেষ অর্থবছর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল সওজ অধিদপ্তর। এর আগের অর্থবছর ২০১৮-১৯ সংস্থাটির অনুকূলে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ থাকলেও বিগত পাঁচ বছর ধরে দেশের সড়ক অবকাঠামোতে খারাপ সড়কের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে। ২০১৫ সালের দিকে দেশের সড়ক অবকাঠামোর প্রায় অর্ধেকই ছিল ভাঙাচোরা দশায়। ২০১৪-১৫ অর্থবছর ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ ছিল সওজ অধিদপ্তরের মোট সড়কের ৪৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। পরের অর্থবছর তা কমে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশে। একইভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছর ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছর দেশে ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশে।
দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে সওজ অধিদপ্তর। এর মধ্যে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে গত দুই বছরে। দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নতিকে গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক উন্নয়নের সুফল হিসেবে অভিহিত করছেন সওজ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী কাজী শাহিরয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই সারা দেশের সড়ক অবকাঠামোয় প্রচুর উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলোর পরিধি বেড়েছে। উন্নয়ন কাজগুলোর গুণগত মান আমরা বজায় রাখছি। এর সুফল হিসেবে প্রতি বছরই দেশে ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ কমছে।
তবে দেশে ভাঙাচোরা সড়কের পরিমাণ কমলেও তা টেকসই হচ্ছে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, সড়ক টেকসই করতে হলে মোটামুটি তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া অপরিহার্য। প্রথমটি ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়টি আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা। তৃতীয়টি হলো যানজট কমিয়ে আনা। দুঃখের বিষয়, এ তিনটির কোনোটিই আমরা করতে পারছি না। ওভারলোডের কারণে যে সড়ক ১০-১৫ বছর ভালো থাকার কথা, সেটি এক বছরও টিকছে না। পানি জমে সড়ক নষ্ট হচ্ছে। ধীরগতি আর যানজটে থাকা গাড়ির চাপেও দ্রুত নষ্ট হচ্ছে সড়ক। এর প্রভাবে প্রতি বছরই কিন্তু আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়টা বেড়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের শুধু খারাপ সড়কের পরিমাণ কমালেই হবে না, টেকসই সড়কের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।










