দেশে অর্ধশতাধিক সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ঋণ প্রদান, আমানত সংগ্রহসহ নানামুখী আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমানত সংগ্রহ ও ঋণ প্রদানে এক প্রকার প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে ব্যাংক খাতে। এর পরও চট্টগ্রামে শ্রমঘন এলাকা ঘিরে বেড়েছে ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির নামে বিভিন্ন সমিতির তত্পরতা। সমবায় সমিতির নাম নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে উধাও হওয়ার ঘটনাও বেশি এসব এলাকায়। ফলে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা।

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শ্রমঘন অঞ্চল চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (সিইপিজেড)। ডবলমুরিং থানাধীন ওই এলাকায় দুটি ইপিজেডসহ রফতানিমুখী শিল্প এলাকার কারণে সমবায় কার্যালয়ের নিবন্ধন নিয়ে সমবায় ও ঋণদান কার্যক্রম এবং বহুমুখী সমবায় কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান ও আমানত সংগ্রহ করছে কয়েকশ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আমানত সংগ্রহের একপর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই লাপাত্তা হয়ে গিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের সবচেয়ে আলোচিত অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে ইপিজেড এলাকায়। এলাকার রূপসা সমবায় ও ঋণদান সমিতি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইপিজেড এলাকায় ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। হাজার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে অতিমুনাফার লোভ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়েও নিয়েছে। সম্প্রতি ইপিজেড এলাকার বেশকিছু গ্রাহক অর্থ ফেরত নিতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি তা দিতে ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত না দিয়ে কার্যালয়ে তালা দিয়ে পালিয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা।

চট্টগ্রাম জেলা সমবায় কার্যালয়ের তথ্যমতে, সিটি করপোরেশন এলাকায় সমবায় দপ্তরের জোন রয়েছে তিনটি। পাঁচলাইশ, ডবলমুরিং ও কোতোয়ালি থানাকে জোন ধরে সমবায় ও ঋণদান এবং বহুমুখী সমবায় সমিতি নিবন্ধন দেয় সমবায় কার্যালয়। এর মধ্যে ডবলমুরিং থানা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ৩৬৩টি ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আর্থিক লেনদেনের নিবন্ধন নিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাঁচলাইশ জোনে ১৭১টি এবং কোতোয়ালি জোনে ১০৬টি প্রতিষ্ঠান সমবায়ের নিবন্ধন নিয়েছে। ইপিজেড এলাকার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা রূপসা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সমবায় সমিতি ও প্রাইম স্টার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড। এ দুটি মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান সিইপিজেডের সামনের একটি শপিং মলে অফিস নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। দুটি প্রতিষ্ঠানই ২০২১ সালের শেষ দিকে গ্রাহকদের হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পরিশোধ না করে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। শ্রমজীবীদের আকৃষ্ট করতে প্রতিদিন বিকাল থেকে অফিস কার্যক্রম পরিচালনা, সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে ঋণ গ্রহণ কিংবা সঞ্চয়ের টাকা জমা নেয়ার সুযোগ নিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে প্রতিষ্ঠান দুটি।

একইভাবে সিইপিজেডের সামনের চৌধুরী মার্কেটে ভাড়া অফিসে কার্যক্রম শুরু করে প্রাইম স্টার। এ প্রতিষ্ঠানও হাজার হাজার গ্রাহকের কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রূপসার চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান এবং একই মাসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন হাওলাদারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জামিনে বের হয়ে তারা পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইপিজেড থানা কর্তৃপক্ষ।

সিইপিজেডের বহুজাতিক ইয়ংওয়ান গার্মেন্টসে অপারেটর হিসেবে কাজ করেন নাজমা বেগম (৩২)। তিনি রূপসা মাল্টিপারপাসে নিজের ও আত্মীয়স্বজনের প্রায় ৯ লাখ টাকা সঞ্চয় করেন বিভিন্ন মেয়াদি স্কিমে। কিন্তু মেয়াদ পূর্তির পরও নাজমা বেগমের টাকা ফেরত না দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টালবাহানা করেন রূপসার কর্মকর্তারা। সিইপিজেডের গার্মেন্টস শ্রমিক আবদুর রব, মোহাম্মদ কামাল কিংবা আসমা বেগমেরও লাখ লাখ টাকার সঞ্চয় ফেরত দেয়নি রূপসা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ।

অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা দিনের বেলায় আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতে পারেন না। গার্মেন্ট শ্রমিকদের রাত পর্যন্ত কাজ করে বাসাবাড়িতে ফিরতে হয়। ফলে স্বাভাবিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সঞ্চয় স্কিম গ্রহণ কিংবা ঋণ গ্রহণের মতো কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন না তারা। আবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও থাকে বন্ধ। যার কারণে ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনে অনাগ্রহী শ্রমিকরা। এ সুযোগে মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই বৈকালিক কার্যক্রম ছাড়াও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিস কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শ্রমিকদের আকৃষ্ট করছে সবচেয়ে বেশি। এভাবে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে হাজার হাজার গ্রাহকের আমানত ফেরত না দিয়ে ইপিজেড এলাকা থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে জেলা সমবায় কার্যালয়ের সমবায় কর্মকর্তা মো. মুরাদ আহাম্মদ কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং জোনের সমবায় কর্মকর্তা সুমিত কুমার দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, সমবায়ের নিবন্ধন নিয়েও অনিয়ম আর প্রতারণার কারণে আমরা প্রতিষ্ঠান দুটির স্থাবর সম্পত্তি রেজিস্ট্রি না করতে এরই মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, এসিল্যান্ড অফিসে চিঠি দিয়েছি। ইপিজেড এলাকার সব ব্যাংকের রূপসা ও প্রাইম স্টারের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে চিঠি দেয়া হয়েছে।