ঝালকাঠিতে একটি যাত্রীবাহী বাস পুকুরে পড়ে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আরো প্রায় ৩৫ জন আহত হয়েছে। সদর উপজেলার গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে গতকাল সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঝালকাঠি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসির উদ্দিন সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওসি নাসির উদ্দিন জানান, তিন শিশু, আট নারী, ছয় পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় ৩৫ জনকে উদ্ধার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তারেক রহমান (৪৫), সালাম মোল্লা (৬০), শাহীন মোল্লা (২৫), রাবেয়া বেগম (৮০), সুমাইয়া (৬), রহিমা বেগম (৬০) ও আবুল কালাম; বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চর বোয়ালিয়ার আব্দুল্লাহ (৮); মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার রিপা মনি (২) ও আইরিন আক্তার (২২); ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার নয়ন (১৬), খুশবো আক্তার (১৭) ও খাদিজা বেগম (৪৩) এবং কাঁঠালিয়ার সালমা আক্তার মিতা (৪২)। পরিচয় শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আহতদের মধ্যে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন আবুল বাশার কাঁঠালিয়া, রাসেল মোল্লা ভাণ্ডারিয়া, ফাতিমা ভাণ্ডারিয়া, রাসেল ভাণ্ডারিয়া, মিফতা নলছিটি, রিজিয়া কাঁঠালিয়া, আরজু কাঁঠালিয়া, মনোয়ারা রাজাপুর, সুইটি ভোলা, রুকাইয়া বাউফল, আজিজুল নলছিটি, আলাউদ্দিন রাজাপুর, সোহেল রাজাপুর, আবুল কালাম রাজাপুর, আকাশ বরগুনা, সোহাগ সাতক্ষীরা, নাঈমুল মঠবাড়িয়া, সিদ্দিকুর বাউফল, মনিরুজ্জামান ভাণ্ডারিয়া, আল-আমিন ঝালকাঠি, সাব্বির বরিশাল। এছাড়া দুজনকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যাদের নাম জানা যায়নি।
উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে আহত হয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ফয়সাল রহমান বাবু। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় আমি পরিষদের সামনেই ছিলাম। পুলিশ ও দমকল বাহিনী পৌঁছার আগেই আমরা ৫০-৬০ জন মিলে উদ্ধার অভিযান শুরু করি।’ সড়কের পাশে পুকুর থাকার কারণেই প্রাণহানির সংখ্যা বেশি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ওসি নাসির উদ্দিন সরকার জানান, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা থেকে বাশার স্মৃতি পরিবহন নামের বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৬৫৪৯) ৬০ জনের মতো যাত্রী নিয়ে বরিশালের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ছত্রকান্দায় ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পড়ে যায়। বেপরোয়া গতির কারণে বাঁক ঘুরতে গিয়েই মূলত এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে ঝালকাঠি থানার পুলিশ ও দমকল বাহিনীর ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ শুরু করে।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ফারাহ্ গুল নিঝুম জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুন শিবলীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে আহত যাত্রী রাসেল মোল্লা জানান, ৪০ আসনের বাসটি সকাল পৌনে ৯টার দিকে ভাণ্ডারিয়া থেকে বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করে। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে ওঠানোর ফলে যাত্রী সংখ্যা হয় প্রায় ৭০। বাসটির ছাদেও বেশ কয়েকজন যাত্রী ছিল। দ্রুতগতিতে ছত্রকান্দা ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ অতিক্রমকালে চালক মোহন সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় বাঁক ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সড়কের বাম দিকের পুকুরে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ভাণ্ডারিয়া থেকে অফিসের কাজে বরিশাল যাচ্ছিলাম। বসা ছিলাম বাসের মাঝখানের একটি সিটে। চালকের পাশে অনেক ভিড় ছিল, তাই কিছুই দেখতে পারিনি। কয়েকটি ধাক্কা লাগে। কিছু বোঝার আগেই দেখি পুকুরের মধ্যে। জানালা দিয়ে বের হয়ে কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছি।’
ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম মাসুম বলেন, ‘আমি পরিষদে লোকজন নিয়ে বসে ছিলাম। হঠাৎ শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি বাসটি পুকুরে পড়ে গেছে। এর মধ্যে পরিষদে যারা ছিল এবং আশপাশের লোকজন ছুটে এসে যে যেভাবে পারে যাত্রীদের বাঁচানোর চেষ্টা করে।’
ঝালকাঠির পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হবে। পাশাপাশি আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন স্যারের পক্ষ থেকে নিহত ১৭ জনের পরিবারকে মরদেহ দাফন ও পরিবহনের জন্য ১ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।’









