চাহিদার উচ্চপ্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে সরকার। তবে প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চাহিদা না বাড়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি অংশ অলস বসে ছিল। বিদ্যুৎ খাতের এ সংকটকে আরো ঘনীভূত করে কভিড-১৯ পরিস্থিতি। মার্চে দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্তের পর পরবর্তী দুই মাসে চাহিদা কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করলে বাড়তে থাকে বিদ্যুতের উৎপাদনও। যদিও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না চাহিদা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আগের মাসের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। পরের মাসেও সাড়ে ৩ শতাংশের মতো বেড়েছে উৎপাদন। কিন্তু করোনার ধাক্কায় মার্চ থেকে উৎপাদন কমতে শুরু করে। মার্চে আগের মাসের চেয়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায় বিদ্যুতের উৎপাদন। এরপর এপ্রিলে তা কমে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বিদ্যুতের উৎপাদন কমা-বাড়ার মূল কারণ চাহিদা। করোনা মহামারীর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দিনে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৬ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট এবং রাতে চাহিদা ছিল ৪ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। ফেব্রুয়ারিতে দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৭ হাজার ৭৪২ মেগাওয়াট, রাতে ছিল ৯ হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট। কিন্তু করোনার কারণে অফিস ও শিল্প-কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় মার্চ-এপ্রিল সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসে। তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে আসায় দেশে শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সেই সঙ্গে আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে উৎপাদনও।
গত আগস্টে দিনে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট, রাতে ১২ হাজার ৫৭৭ মেগাওয়াট। এছাড়া গত মাসে বিদ্যুতের দিনের বেলায় চাহিদার পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট, রাতে চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৪২৮ মেগাওয়াট।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুতের ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ আবাসিক গ্রাহক, ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ শিল্প-কলকারখানা, ১২ দশমিক ১ শতাংশ বাণিজ্যিক সংযোগ, কৃষিতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ২ দশমিক ২ শতাংশ গ্রাহক।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব ড. সুলতান আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাকালে বিদ্যুতের চাহিদা কমে গিয়েছিল। সেটি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় এসেছে। তবে যে প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল সেটি হয়নি। সেক্ষেত্রে চাহিদাটা এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক পর্যায়ে আসেনি। আগামীর যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সেটি করোনায় বাধাগ্রস্ত হলেও এখন তা আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ফলে সরকারের লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ে পূরণ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বিদ্যুতের ব্যবহার ৫৫-৬০ শতাংশ বাড়বে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা, ২০১০ অনুযায়ী, দেশে ২০২০ সালে বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ করা হয় ১৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ধারাবাহিকভাবেই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৩ হাজার ৫৪৮ মেগাওয়াট। চাহিদা না থাকায় এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে গত বছরের ২৫ মে, ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার ৪০ শতাংশই অলস পড়ে থাকছে। যদিও অলস এসব বিদুৎকেন্দ্রের পেছনে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় হচ্ছে বড় অংকের অর্থ। গত এক দশকে এ খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে সরকারকে।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ২০১৪-১৫ অর্থবছর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৫ হাজার ৩৮০, ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৫ হাজার ৬০০, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৬ হাজার ২৪০ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৮ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা দিতে হয়েছে।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদা সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে এগিয়ে চলছে। তবে কভিডের কারণে চাহিদা কমে গিয়েছিল, এখন তা আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যমাত্রায় কিছুটা হলেও এ মহামারী প্রভাব ফেলবে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা সে অনুযায়ী বাড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাহিদা তো আছেই। সেটি বাড়াতে সরকার কাজ করছে। বর্তমান অবস্থার চেয়ে আগামী বছর আরো ১০ শতাংশ চাহিদা বাড়বে। ফলে ধীরে ধীরে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে চলে আসবে।
দেশে করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৩১ দিনের ছুটি ঘোষণা করে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা আরো কয়েক দফায় বাড়িয়ে ৩০ মে করা হয়। এরপর কলকারখানা ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হলেও এখনো বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
কভিড-১৯-এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২১ সালকে লক্ষ্য করে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে ১১-১৫ হাজার মেগাওয়াট। দেশে চলমান বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে আসবে। বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদা অনুযায়ী ২০২৩ সালে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ২০ থেকে ৩৬ হাজার মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসায় ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দু-তিন বছর এভাবেই চলতে থাকবে। অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে ২০২৩ সাল নাগাদ বিদ্যুতের যে চাহিদার কথা বলা হয়েছিল তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে এবং অতিরিক্ত এ বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে। একই সঙ্গে ২০২১ সাল নাগাদ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনাময় শিল্প-কারখানার জন্য যে তেল-বিদ্যুতের চাহিদার কথা বলা হচ্ছে সে ধরনের শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের এ অবস্থা একদিনের নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। ২০৪১ সাল পর্যন্ত সরকার বিদ্যুৎ নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছে তাতে অব্যাহতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়বে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ অব্যবহূত থাকবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। এক্ষেত্রে ভোক্তাদেরই সেই মূল্যবৃদ্ধির অযৌক্তিক ব্যয় গুনতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ যদি ব্যবহূত না হয় তাহলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে।
উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহার আগামীতে শিল্প খাতে বাড়বে কিনা সরকারের এমন পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, এটির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে সরকারের কোনো গবেষণা কিংবা স্টাডি নেই। বাস্তব অবস্থার বিপরীতে ধারণাকৃত এসব কথাবার্তা অর্থনীতিকে কঠিন অবস্থায় নিয়ে যাবে।










