ক্রিসেন্ট গ্রুপের মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনাগুলোকেই বিদেশে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি সম্প্রতি উচ্চ আদালতে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন অর্থ পাচারের ঘটনার তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে শুধু ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোই পাচার করেছে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট গ্রুপের রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, লেক্সকো লিমিটেড, ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টস ও রিমেক্স ফুটওয়্যার বিদেশে মোট ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা পাচার করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে এমএ কাদের ও এমএ আজিজ—এ দুই ভাই চিহ্নিত হয়েছেন এ বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের মূল হোতা হিসেবে।
তাদের মধ্যে বড় ভাই এমএ কাদের রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, লেক্সকো লিমিটেড ও ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টসের চেয়ারম্যান। ছোট ভাই এমএ আজিজ রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার। এর মধ্যে এমএ কাদের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় আট মাস জেল খেটে বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। এমএ আজিজ পলাতক। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন।
ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব অর্থ পাচারের ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। কমিশনের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সবক’টি মামলার তদন্তকাজ চলছে। বেশকিছু কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে। তদন্তে পাচারকৃত অর্থের আরো খোঁজ মিলেছে। সেসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এ মামলার প্রকৃতি কিছুটা জটিল। প্রথমে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ এলসির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা বিভিন্নভাবে ‘লেয়ারিং’ করে পরে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ কারণে মামলার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে আরো বেশকিছু সংস্থার সহায়তা নিতে হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাইকোর্টে উপস্থাপিত দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ শাখার তথ্য বলছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংক থেকে রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যারের নামে নেয়া ঋণের ৪৫৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্মসাত্পূর্বক তা বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছে। এ অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এমএ কাদেরসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়।
একই দিনে ৫০০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয় ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের নামে। সে মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরসহ ১৫ জন। লেক্সকো লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে এমএ কাদেরের নামে আরেকটি মামলা করা হয়। এতে ৭৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছাড়াও মামলাটিতে আসামি হিসেবে আরো ১৫ জনের নাম রয়েছে। ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টসের চেয়ারম্যান হিসেবে কাদেরের বিরুদ্ধে করা আরেকটি মামলায় ৬৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। সে মামলায় আসামি করা হয়েছে আরো ১৫ জনকে।
৬৪৮ কোটি ১২ লাখ টাকা ঋণের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে ছোট ভাই এমএ আজিজের বিরুদ্ধে। দুদকের নথির তথ্য অনুযায়ী, রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে এ ঋণ নিয়ে উত্তোলিত অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন এমএ আজিজ। এ মামলায় আজিজের সঙ্গে আসামি হিসেবে রয়েছেন আরো ১৬ জন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিধি অনুযায়ী অর্থ পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার রয়েছে দুদকের। এক্ষেত্রে আইনের বেঁধে দেয়া ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে দুদক। অর্থ পাচারকারীদের শাস্তি নিশ্চিতে সব ধরনের উদ্যোগই নেয়া হবে।
এর আগে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদের ও জনতা ব্যাংকের দুই ডিএমডিসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। মামলা দায়েরের দিনই এমএ কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) গত বছরের নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের তালিকার শীর্ষ তিনটি প্রতিষ্ঠানই জনতা ব্যাংকের গ্রাহক ক্রিসেন্ট গ্রুপের। এর মধ্যে রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের কাছে ব্যাংকটির মোট পাওনার পরিমাণ ১ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার বেশি। ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টসের খেলাপি ঋণ রয়েছে ১ হাজার ২৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তালিকার তৃতীয় অবস্থানে থাকা একই গ্রুপের রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার লিমিটেডের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা রয়েছে ১ হাজার ২৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। পাওনার বিপরীতে কোনো অর্থই পরিশোধ করেনি ক্রিসেন্ট গ্রুপের এ তিন প্রতিষ্ঠান। এসব ঋণ আদায়ে আইনানুগ সব পদক্ষেপই গ্রহণ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অর্থ উদ্ধারে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে জনতা ব্যাংক। গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঢাকা প্রথম অর্থঋণ আদালতে জনতা ব্যাংকের পক্ষে লোকাল অফিসের মহাব্যবস্থাপক মামলাগুলো করেন। চারটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে এমএ কাদেরকে। একটিতে করা হয়েছে এমএ আজিজকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে বোর্ডে আলোচনা হবে। সে পরিপ্রেক্ষিতে খোঁজখবর নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে দুদক মামলা করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টি দেখভাল করছে।










