সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ১৩ বছর আগে নগরীর নয়টি স্থানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)। লক্ষ্য ছিল পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সরকারের রাজস্ব বাড়ানো। তবে এসব ভবনে দোকান বরাদ্দ দিয়ে রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও অধিকাংশই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। দোকান বরাদ্দ না দেয়া, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাসহ বিভিন্ন কারণে এক যুগে অর্ধশত কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। পরিত্যক্ত এসব ভবন এখন মাদকাসক্ত ও জুয়াড়িদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, এসব ভবনে প্রতি বর্গফুট বাবদ দোকান ভাড়া ৩ টাকা। তিন বছর পরপর ভাড়া বাড়ানোর হার ১৫ শতাংশ। তবে এ ১৫ শতাংশ বাদ দিয়েই প্রায় এক যুগে নয়টি মার্কেটের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ১৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৯৪ টাকা। চার দফায় শতকরা ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো বাবদ সরকার রাজস্ব হারিয়েছে ৭ কোটি ৮৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৬ টাকা। এছাড়া অনির্মিত দোকান, বরাদ্দ না দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে আরো ২৫-৩০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সব মিলিয়ে এক যুগে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।

শিরোইল কাঁচাবাজার পূবালী মার্কেট নির্মাণ করেছেন ঠিকাদার জহির হোসেন। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভবন নির্মাণে কোটি টাকা খরচ করে বিপাকে পড়েছি। কাজ করেও বরাদ্দ পাচ্ছি না। কয়েকজন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী বরাদ্দ পেলেও আরডিএ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিতে হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ। পরবর্তী সময়ে এমন দুর্নীতি ও বরাদ্দহীনতার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয়েছে কাজ থেকে। এসব কারণে শুধু আমিই নই, সব ঠিকাদারই বাকি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। সাধারণ ব্যবসায়ীরাও দোকান বরাদ্দে যে আবেদন করেছেন ও অর্থ জমা দিয়েছেন তাতেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।’

ভবন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদার ও আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আরডিএ কর্তৃপক্ষ নগরীর সাহেব বাজারে সাততলাবিশিষ্ট মার্কেট নির্মাণের অনুমতি দেয়। তবে মার্কেটটি নির্মাণ হয় চারতলা। নির্মাণ করেন ঠিকাদার ইফতেখার হাফিজ খান। মার্কেটের মোট আয়তন ১ লাখ ১০ হাজার বর্গফুট। তবে নির্মিত চারতলার আয়তন ৬২ হাজার ৮৫৮ বর্গফুট। বাকি তিনতলার কাজ পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে আরডিএ মাসিক রাজস্ব হারিয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৭৪ টাকা এবং ১৩ বছরে আরডিএ তথা সরকার রাজস্ব হারিয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ১৭ হাজার ৫৯৪ টাকা। ২০০৯ সালে সাহেব বাজারে নির্মিত হয় পঞ্চম তলাবিশিষ্ট আরো একটি বাণিজ্যিক ভবন। প্রতি ফ্লোর (তিনদিকে) ছয় হাজার বর্গফুট। সে হিসেবে মার্কেটের আয়তন দাঁড়ায় ৩০ হাজার বর্গফুট। তবে দোকান বরাদ্দ না হওয়ায় প্রতি মাসে ৯০ হাজার টাকা রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে সরকার। সে ক্ষেত্রে ২০০৯ সালে নির্মিত এ মার্কেট থেকে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১২ সালে আরো একটি চারতলা ভবন নির্মাণ হয়। এর আয়তন ৪২ হাজার বর্গফুট। ভবনটি থেকে সরকার প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। সেক্ষেত্রে ১০ বছরে রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২০১০ সালে শিরোইল কাঁচাবাজারে ২২ হাজার বর্গফুটের চারতলাবিশিষ্ট পূবালী মার্কেট নির্মাণের কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নির্মাণ হয় তিনতলা। বাকি একতলা নির্মাণ হয়নি। এ ভবন থেকে ১৩ বছরে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

২০১২ সালে নির্মাণ করা হয় মহানন্দা আবাসিক সুপার মার্কেট। চার হাজার বর্গফুটের ভবনটি ছয়তলাবিশিষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও চারতলা পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে। ১০ বছরে এ ভবন থেকে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ৭২ লাখ টাকা। একইভাবে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সুপার মার্কেট থেকে ৩ কোটি ৮২ লাখ ৪০ হাজার টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।

আরডিএর নয়টি বাণিজ্যিক ভবন থেকে এ যাবৎকালে কত টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে জানতে চাওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির এস্টেট অফিসার মো. বরুজ্জামানের কাছে। তবে তিনি তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বণিক বার্তার প্রতিনিধিকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারব না। আমার সঙ্গে কথা বলার এখতিয়ার আপনার নেই। আমার সঙ্গে কথা বলতে হলে চেয়ারম্যান স্যারের অনুমতি নিতে হবে।’

তবে আরডিএর বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় দুর্নীতি ও অবহেলার কথা স্বীকার করে চেয়ারম্যান (যুগ্ম সচিব) মো. জিয়াউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব একদিনের সমস্যা না। এগুলো ৫০ বছরের সমস্যা। এগুলো নিয়ে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। ধীরে ধীরে এসব সমস্যার সমাধান হবে। তবে রাজস্ব উঠছে না এ কথা একেবারে সত্য না। কিছু রাজস্ব আদায় হচ্ছে। বাকি সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে রাজস্ব আরো বাড়বে।’