রেল পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় পদের কর্মীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে রেলওয়ে প্রশাসন। দীর্ঘদিনের নিয়ম লঙ্ঘন করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে তোয়াক্কা না করে কর্মীদের ন্যায্য হিস্যাবঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। এতে সার্বিক পরিচালন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সেবার মান কমছে রেলের।

১৯৭৭ সালের সরকারি বেতন কাঠামোয় স্টেশন মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টার, স্টেশন মাস্টার গ্রেড ১ থেকে ৪ ও স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে রেলের একই পোস্টের বিভিন্ন কর্মীর বেতনবৈষম্য সৃষ্টি হয়। ফলে রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতিসহ পাঁচজন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। ২০০৯ সালের ১৬ আগস্ট শুনানিতে রিটের রায় পিটিশনারদের অনুকূলে ঘোষণা করার পর ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রিভিউ পিটিশনটি তামাদিতে খারিজ হয়ে গেলে রেলওয়ের স্টেশন মাস্টাররা গ্রেড উন্নীত করার দাবি চূড়ান্তভাবে অর্জন করেন। কিন্তু এখনো রেলওয়ে আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেনি। সুপ্রিম কোর্টের রায়, রিভিউ ও কনটেম্পট পিটিশনের রায় বাস্তবায়ন না করে রেলওয়ে শুধু রিটে স্বাক্ষরকারীদের সুবিধা দেয়া হবে বলে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়ন আন্দোলন শুরু করেছে। আদালতের রায় মেনে নেয়া হলে ধর্মঘটসহ যেকোনো ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।

২০২১ সালের শুরু থেকেই রেলওয়ে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়ে রানিং কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি বিষয়ে আন্দোলন নিয়ে। ২৫ জানুয়ারি থেকে স্বাভাবিক কাজের বাইরে অতিরিক্ত সময়ে ট্রেন পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করেন রানিং স্টাফরা, যার কারণে কর্মী সংকটে ধুঁকতে থাকা রেলওয়ের সারা দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনের যাত্রা বাতিল ও ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয় হয়। এরপর ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হলে বড় ধরনের সংকট এড়াতে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দাবি মেনে নেয়া সাপেক্ষে ধর্মঘট সাময়িক প্রত্যাহার করা হলেও ওই জটিলতা এখনো কাটেনি।

এ-সংক্রান্ত নথিপত্র থেকে জানা গিয়েছে, রেলের পরিবহন বিভাগের রানিং স্টাফদের মধ্যে রয়েছেন যথাক্রমে লোকোমাস্টার (এলএম), সহকারী লোকোমাস্টার (এএলএম) ও সাব-লোকোমাস্টার বা শান্টিং লোকোমাস্টার (এসএলএম), ক্যারেজ অ্যাটেন্ডেন্ট, গার্ড, টিকেট ট্রেকার (টিটি)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপনে ক্যারেজ অ্যাটেন্ডেন্টদেরও মাইলেজ সুবিধায় আনা হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে রানিং স্টাফদের মধ্যে লোকোমাস্টারদের নির্ধারিত বেতন-ভাতার বাইরে প্রতি ১০০ মাইল ট্রেনযাত্রায় একদিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দেয়া হতো। তবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর লোকোমাস্টারদের বাইরে অন্যান্য রানিং স্টাফ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে মাইলেজ সুবিধা পেয়ে আসছেন। অ্যাটেন্ডেন্ট, গার্ডদের একদিনের মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ অর্থ দেয়া হতো।

১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ের বেতন-ভাতা প্রদান ছিল স্বতন্ত্র। করোনাকালে জটিলতার মুখে রেলকর্মীদের বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগার থেকে প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শুরুতে আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারে রেলের পরিবহন বিভাগের বিশেষ ভাতা সংযুক্তি নিয়ে বিপাকে পড়ে রেলওয়ে। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি রানিং স্টাফদের মাইলেজ সুবিধা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। এতে কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছেন রেলওয়ে কর্মীরা। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে রানিং স্টাফদের মাইলেজ সুবিধা সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের সমপরিমাণ করে দেয়া হলে বৃহত্তর আন্দোলনে গিয়েছেন রেলকর্মীরা। সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া না হলে স্বল্প জনবলে কার্যক্রম চালানো রেলওয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. হুমায়ুন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীরা সংকটের মধ্যেও জীর্ণশীর্ণ রেলওয়েকে সচল রাখতে কাজ করছেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী রেলওয়ে কর্মীরা যেসব সুযোগ-সুবিধা ব্রিটিশ আমল থেকে পেয়ে এসেছেন, রেলওয়ে সেগুলোও দিতে চাইছে না। নতুন করে নিয়োগবিধি তৈরির মাধ্যমে রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুবিধাও কর্তন করে অত্যাবশ্যকীয় কর্মীদের ঠকানো হচ্ছে। সারা দেশের বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে রেলওয়ের বিভিন্ন পদের কর্মচারীরা এসবের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমরা রেলওয়ের এসব অনিয়মের প্রতিবাদ জানাই। দ্রুত সময়ের মধ্যে রেলওয়ের সব শ্রমিক-কর্মচারীর দাবি মেনে নেয়া না হলে আগামীতে বৃহত্তর কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৯৭ সালে রেলের রানিং স্টাফদের দেয়া মাইলেজ সুবিধাকে বিশেষ সুবিধা বিবেচনায় মূল বেতন-ভাতা প্রদানের পরবর্তী মাসে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সময় রানিং স্টাফরা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আবেদন জানালে তৎকালীন সরকার মাইলেজ সুবিধাকে রানিং স্টাফদের ‘পার্ট অব পে’ ঘোষণা দেয়। ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ভিত্তিতে রানিং অ্যালাউন্স প্রদানের প্রস্তাব দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রানিং স্টাফদের বিশেষ এ ভাতা প্রদানের প্রস্তাব অনুমোদন করেন। কিন্তু বর্তমানে রানিং সুবিধা সীমিত করায় রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের কর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

সর্বশেষ চলতি বছরের মাঝামাঝিতে রেলওয়ে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে টিএলআর (টেম্পরারি লেবার রিক্রুটমেন্ট) পদ্ধতি থেকে সরে আসার ঘোষণার পর থেকে। আগে রেলওয়ে আইন অনুযায়ী টিএলআর হিসাবে কর্মরত একজন কর্মী একটি নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী লোকবলে পরিণত হতেন। লোকবল সংকটের কারণে রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশে অন্তত পাঁচ-ছয় হাজার টিএলআর নিয়োগ দিয়েছে। সম্প্রতি টিএলআর বাদ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগের পরিকল্পনা করলে বর্তমানে কর্মরত টিএলআররা আন্দোলন শুরু করেছেন, যার কারণে সর্বশেষ গত সপ্তাহে টিএলআরদের কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে রেলের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা ট্রেন কন্ট্রোলারসহ পরিবহন বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মীদের সঙ্গেও আগের জারি থাকা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের।

যোগাযোগ করা হলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) মো. ইয়াসীন বণিক বার্তাকে বলেন, আমি এ মন্ত্রণালয়ে এসেছি অল্প কিছুদিন হয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরাই ভালো মন্তব্য করতে পারবেন। এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রেলওয়ে কন্ট্রোলারদের দাবি, ‘কঠিন প্রকৃতির কষ্টসাধ্য দায়িত্ব’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ট্রেন কন্ট্রোলারদের মূল বেতনের সঙ্গে ৩০ টাকা অতিরিক্ত ভাতা দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৩০ টাকার পরিবর্তে কন্ট্রোলারদের তিনটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট দেয় এবং ১৯৮০ সাল থেকে চারটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্টকে পার্ট অ্যান্ড পার্সেল পে হিসেবে সব ভাতা দিয়ে আসছে। কিন্তু ট্রেন কন্ট্রোলারদের এসব সুবিধা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আন্দোলনের দিকে যাচ্ছেন ২৪ ঘণ্টা পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করা রেলের গুরুত্বপূর্ণ এসব কর্মী।

রেলওয়ের একজন ট্রেন কন্ট্রোলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, একজন কন্ট্রোলার যেকোনো উৎসব, ঝড়, বৃষ্টি, যুদ্ধসহ যেকোনো দুর্যোগকালে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু শত বছর ধরে চলে আসা কন্ট্রোলারদের এসব সুবিধা কোনো কারণ ছাড়াই বাতিল করা হয়েছে। কন্ট্রোলাররা কর্মবিরতিতে গেলে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগে বিপর্যয় নেমে আসবে। দাবি মেনে নেয়া না হলে কন্ট্রোলাররা সেই পথেই হাঁটবেন।