পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। ফলে দুই লেনের এ মহাসড়কে দুর্ঘটনাও বেড়েছে। প্রকল্প নিলেও নানা জটিলতায় আটকে গেছে এ মহাসড়ক ফোর লেনে উন্নীতকরণ কাজ। তাই মহাসড়কের যানজট ও দুর্ঘটনা রোধে বরিশাল অংশের ১৩ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তে ৫২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। আর সে কাজটি করতে গিয়ে কাটা পড়ছে মহাসড়কের পাশে থাকা শতবর্ষী ৪০২টি গাছ।
বরিশাল সওজ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ফোর লেনে উন্নীত করার প্রস্তাব ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় জমি অধিগ্রহণের জন্য। সর্বশেষ গত অর্থবছরে বরাদ্দের ৩৭১ কোটি টাকা কাগজে-কলমে আটকানো হলেও অধিগ্রহণ হয়নি এক ইঞ্চি জমি।
সূত্র বলছে, ঢাকা ও বরিশাল সওজ বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতার কারণেই মূলত এ কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের নেয়া বৃহৎ প্রকল্পটি।
বরিশাল সওজ বিভাগের সার্ভেয়ার মো. আরিফুর রহমান জানান, ফোর লেনের জন্য চার জেলায় জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এরই মধ্যে বরিশালের গৌরনদী ও উজিরপুরের কাজ শেষ হয়েছে। বাকেরগঞ্জের কাজ চলমান, কিন্তু সদর উপজেলা তথা নগরীর মধ্যে ২০ কিলোমিটারে জমি অধিগ্রহণকাজ শুরু করা যায়নি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমেজ অ্যান্ড ইনফরমেশনের নির্বাহী পরিচালক হাসান আবিদুর রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯৬০-৬৫ সালের মধ্যে নির্মিত এ সড়কটির প্রশস্ত ছিল মাত্র ১২ ফুট। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এটিকে ১৮ ফুট করে সড়ক বিভাগ। সর্বশেষ ২০১৮-১৯-এর দিকে আরো ছয় ফুট বাড়ালে এর প্রশস্ততা দাঁড়ায় ২৪ ফুটে। তবে দক্ষিণের প্রবেশদ্বার এ সড়কটির ওজন ধারণক্ষমতা এখনো পাঁচ টন। এর বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করলেই সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে বলেন, ‘৬২ বছরে সড়কের প্রশস্ততা বেড়েছে মাত্র ১২ ফুট। তাও আবার ধারণক্ষমতা পাঁচ টন। এ একটি তথ্যই প্রমাণ করে কতটা অবহেলিত এ অঞ্চল। দীর্ঘ এ সময়ে এখানকার জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যাও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ছয় বছর আগেই বলেছিলেন সড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করতে। অথচ সড়ক বিভাগ এখনো তা করতে পারেনি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৬ সালে ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক ফোর লেন করার প্রাথমিক কাজ শুরু করে সড়ক ও সেতু বিভাগ। ২০১৮ সালে প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করার পর অনুমোদনের জন্য তা তোলা হয় একনেক সভায়। প্রকল্প অনুযায়ী ভাঙ্গা-বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফোর লেনবিশিষ্ট এক্সপ্রেস সড়ক নির্মাণের অনুমোদন দেয় সরকার। বিপরীতমুখী ডাবল লেনের দুটি সড়কসহ ধীরগতির স্থানীয় যানবাহন চলাচলে থাকবে আলাদা দুটি সার্ভিস লেন। সড়কটি হবে ১৭০ ফুট চওড়া।
সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণে বরাদ্দ দেয়া হয় ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর পাস হওয়া ওই প্রকল্প প্রস্তাবে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে জমি অধিগ্রহণকাজ শেষ করতে বলা হয়, কিন্তু ২০২০ তো দূরের কথা, ২০২৩ সালে এসেও সে কাজ শুরুই করতে পারেনি সড়ক ও সেতু বিভাগ। এরই মধ্যে তিনবার ফেরত গেছে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দের টাকা।
এ প্রসঙ্গে সড়ক ও সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক নির্মাণে ঠিক কতটুকু জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব পাওয়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভুলের কারণেই মূলত এ দীর্ঘসূত্রতা। জমি চিহ্নিতের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন তারা সর্বশেষ ম্যাপ পর্চা ব্যবহার করেনি, অন্যদিকে অধিগ্রহণ প্রস্তাবনার জমি চিহ্নিতকরণে ছিল ত্রুটি। ১৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক প্রশস্তকরণে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাব করেছে মাত্র ৩০২ একর জমি অধিগ্রহণের। বিষয়টি নিয়ে খটকা লাগায় পরে আমরা নিজস্ব সার্ভেয়ার দিয়ে জরিপ করি, তখন দেখা যায় জমি লাগবে ১ হাজার ৯১ একর। এমন ভুলের কারণেই নির্ধারিত সময়ে জমি অধিগ্রহণ শুরু করা যায়নি।’
সড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, দপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তার গাছাড়া ভাবের কারণেই মূলত দীর্ঘ সময়েও কাজটি শুরু করা যায়নি। বরিশাল ও ঢাকার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ের অভাবও এক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বাড়িয়েছে। সে সঙ্গে করোনা মহামারীর অজুহাত তো ছিলই। এদিকে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ সংস্থান নিয়ে। শুরুতে এ প্রকল্পে সহায়তার কথা বলেছিল এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। এখন আর তারা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে সওজ বিভাগ বরিশালের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক একেএম আজাদ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরোদমেই চলছে ফোর লেন সড়ক বাস্তবায়নের কাজ। সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি চিহ্নিতের কাজটি এরই মধ্যে শেষ করেছি আমরা। এসব জমি অধিগ্রহণে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয়া হয়েছে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ এবং বরিশালের জেলা প্রশাসনকে। জমি অধিগ্রহণ শুরু করতে ফরিদপুর ও মাদারীপুরে ১১টি ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন কেস খোলা হয়েছে। গোপালগঞ্জ ও বরিশালেও পাঁচটি ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন কেস খোলার প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি অর্থবছরেই উল্লিখিত জেলায় জমি অধিগ্রহণকাজ শেষ করতে পারব আমরা। তবে পটুয়াখালী জেলায় জমি চিহ্নিত করার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় সেখানে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারিনি।’
এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ হয়েছে জানতে চাইলে তার সদুত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়া চলছে।’
জমি অধিগ্রহণ প্রশ্নে গত অর্থবছরে বরাদ্দ হওয়া ৩৭১ কোটি টাকার ব্যয় প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এ টাকা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনগুলোকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ হওয়া কোনো টাকাই এবার আর ফেরত যায়নি।’
এদিকে ফোর লেন প্রকল্প
কাজের অগ্রগতি শ্লথ থাকায় চলমান জটিলতা নিরসনে বরিশালের
গড়িয়ার পাড় থেকে দপদপিয়া সেতু পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্তের কাজ হাতে নিয়েছে সওজ বিভাগ। ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে (পিএমপি) রোড মেজর মেনটেইন্যান্স প্রোগ্রাম নামের এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৪ ফুটের সড়কটিকে ৫৪ ফুটে প্রশস্ত করা হবে বলে জানান সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন।
বাংলাদেশ সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বরিশালের পরিচালক জিয়াউর রহমানের দাবি, ‘পদ্মা, পায়রা ও বেকুটিয়া সেতু চালু হওয়ার পর বরিশালের এ অংশে যান চলাচল বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। যাত্রী ও পণবাহী যানবাহন দূর-দূরান্ত থেকে এ পয়েন্টে এসে যানজটে পড়ে। তাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাইপাসের কোনো বিকল্প নেই।’










