থমকে গেছে রংপুর বিভাগের তিন জেলায় উৎপাদিত টমেটো সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন উন্নয়ন কর্মসূচি। তিন বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা থাকলেও কবে নাগাদ এর কার্যক্রম শুরু হবে তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কতিপয় ব্যয় স্থগিত ও হ্রাসকরণের বেড়াজালে এ কর্মসূচিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে বছরের পর বছর মৌসুমে সংরক্ষণের অভাবে দ্রুত পচনশীল টমেটোর বাজার মূল্য না পাওয়ায় কৃষক গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু চলমান রাষ্ট্রীয় কৃচ্ছ্রসাধনের নীতিতে কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ তারা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রংপুর বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত টমেটো সংরক্ষণ করে ন্যায্যমূল্য পান, টমেটোর বহুমুখী ব্যবহার করে অপচয় রোধ, বাজার সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দরিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, কৃষকের আধুনিক বিপণন কৌশল, ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও বহুমুখী ব্যবহার বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণদানের উদ্দেশ্যে এ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। এজন্য চাষাবাদ ও ফলনের বিষয়টি বিবেচনা করে বিভাগের রংপুর, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে ২০-২৫ টন ধারণক্ষমতার ১০টি সংরক্ষণাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে দুটি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে রংপুর জেলা  সদরে ও মিঠাপুকুর উপজেলায়। দিনাজপুর জেলায় সংরক্ষণাগার হবে পাঁচটি। এর মধ্যে সদরে দুটি, বিরলে দুটি এবং চিরিরবন্দরে একটি। এছাড়া পঞ্চগড় জেলা সদরে দুটি ও বোদা উপজেলায় একটি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে।

২০২১-এর জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি এ কর্মসূচি ওই বছরের জুলাই মাসে অনুমোদন পেলেও অর্থ মন্ত্রণালয়  অর্থ ছাড় করে সেপ্টেম্বরে।  

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘‌অর্থ ছাড় হওয়ার প্রথম এক বছরের বেশি সময় উন্নয়ন কর্মসূচির ভবন নির্মাণসহ মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর কারণ, অনুমোদন দেয়ার সময় নির্দেশনায় বলা হয়, প্রথম বছরে প্রকাশনা ছাড়া অন্য কোনো কাজে অর্থ ব্যয় করা যাবে না। এছাড়া প্রথম প্রকল্প পরিচালক স্বেচ্ছায় কাজটি ছেড়ে দেয়ায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনে কতিপয় ব্যয় স্থগিত ও হ্রাসকরণে সরকারি গেজেট ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর হাতে পাওয়ায় টাকা থাকলেও আমরা খরচ করতে পারছি না। গেজেটে  স্থাপনা নির্মাণ এবং যন্ত্রপাতি ক্রয় করা যাবে না বলে উল্লেখ আছে। তবে যেসব স্থানে সংরক্ষণাগার নির্মাণ হবে সেখানে এরই মধ্যে নির্দেশনা মোতাবেক চার শতক করে জমি নির্বাচনের কাজ শেষ হয়েছে। এখানে টমেটোর কথা বলা হলেও বছরের অন্য সময় আম, কাঁচা মরিচ, লেবু, গাজরসহ ওই এলাকায় যেসব সবজি ও ফল বেশি হয় সেগুলোও যদি একই প্রকৃতির হয় তবে অবশ্যই কৃষক সেখানে রাখতে পারবেন। এটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবে জমি দান করা ব্যক্তি। এজন্য তিনি সুবিধাভোগী কৃষকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ এবং দেখাশোনার জন্য  কিছু টাকা নেবেন। 

রংপুর এবং দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ মৌসুমে রংপুর বিভাগে ৫ হাজার ৫৪৯ হেক্টর জমিতে টমেটো উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯৫ টন। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলায় ২ হাজার ৪৫২ হেক্টর জমিতে টমেটো উৎপাদন হয়েছে ৭৯ হাজার ২ টন। পঞ্চগড়ে ৭৭২ হেক্টর জমিতে টমেটো উৎপাদন হয়েছে ৩১ হাজার ৮৭৪ টন এবং রংপুর জেলায় ৫৫০ হেক্টর জমিতে টমেটো উৎপাদন হয়েছে ১৯ হাজার ১৮ টন।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক রুহুল আমিন এবং সদর উপজেলার কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, আগে নিয়মিত টমেটো আবাদ করতেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায় শুরুতে এক-দেড় মাস উৎপাদিত টমেটোর দাম ভালো পেলেও পরে কমে যায়, বাজারে নিয়ে যাওয়ার খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার পচন থেকে সহজে টমেটো সংরক্ষণ করা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে অধিকাংশ কৃষক টমেটো জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেন। অথচ যদি ওই সময় কিছুদিন টমেটো সংরক্ষণ করা যায় তাহলে ভালো দাম পাওয়া যেত।’

রংপুর বিভাগের বৃহৎ টমেটোর হাট হিসেবে পরিচিত দিনাজপুর সদর উপজেলার শেখপুরার গাবুড়া হাট। শেখপুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, প্রতি বছর ১ এপ্রিল-মে পর্যন্ত চলা হাটে শুধু টমেটোই বিক্রি হয়। এ বছর হাটের ডাক উঠেছে প্রায় ২৯ লাখ টাকা। প্রতিদিন ৪৫-৬০টি ট্রাকে করে ১০-১২ টন টমেটো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। মৌসুমের শুরুতে ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা প্রতি টন টমেটো বিক্রি হলেও মৌসুমের মাঝামাঝি টমেটোর ব্যাপক আমদানির ফলে কেজিপ্রতি ৪ টাকারও নিচে নেমে যায়। তাই এ সময় যদি টমেটো সংরক্ষণ করা যায় তাহলে কৃষকের লাখ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো।’ 

রংপুর বিভাগের তিন জেলার উৎপাদিত টমেটো সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন উন্নয়ন কর্মসূচির বর্তমান পরিচালক নিখিল চন্দ্র দে বলেন, ‘বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কতিপয় ব্যয় স্থগিত ও হ্রাস করার কারণে আমাদের কর্মসূচি বন্ধ আছে। তবে এটি কর্মসূচি না হয়ে যদি প্রকল্প হতো তাহলে কাজ চলমান থাকত। কারণ রাজস্ব থেকে আসে কর্মসূচির টাকা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সম্প্রতি এ বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনা চেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।’

রংপুর বিভাগীয় বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি এবং রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মো. রিয়াজ শহীদ শোভন বলেন, ‘করোনা মহামারীর সময় কৃষিই আমাদের টিকিয়ে রেখেছে। তাই তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত কৃষকবান্ধব কর্মসূচি যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় এজন্য প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।’