বরেন্দ্র অঞ্চলের গো-খামারিদের পথ দেখাচ্ছে রাজশাহীর দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামার। গরুর প্রসিদ্ধ জাত শাহীওয়াল সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কাজ করছে জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ীতে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত খামারটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাহীওয়াল জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ছাড়াও পুষ্টিসমৃদ্ধ দুধ সরবরাহ, মাংসের ঘাটতি মেটাতে এঁড়ে বাছুর বিক্রি, উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ করছে এ খামার। সরেজমিনে খামার পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন খামারিরা। হাতেকলমে নিচ্ছেন প্রশিক্ষণ।
রাজশাহীর এ খামারের গোড়া পত্তন ১৯৬৮ সালে। তখন খামারটি এস্টাবলিস্টমেন্ট অব ডেইরি অ্যান্ড ক্যাটল ব্রিডিং ফার্ম নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭৭ সালে এর নামকরণ হয় নর্দার্ন ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট ফার্ম। ১৭৯ একর জমিতে এ খামার গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে ১৭৮টি গাভী নিয়ে রাজশাহী ডেইরি অ্যান্ড ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট ফার্ম নামে যাত্রা হয় এ খামারের।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ খামারে বর্তমানে ৩৫৪টি গবাদিপশু রয়েছে। খামারে দৈনিক প্রায় ২০০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। গবাদিপশুর খাদ্যের জোগান আসে খামারের বিশাল এলাকাজুড়ে চাষ করা ঘাসে। দৈনিক ৯-১০ হাজার কেজি ঘাস সরবরাহ হয় খামারে। খামার থেকে দৈনিক এক টন গোবর উৎপাদন হয়। এর একটি বড় অংশ জৈবসার উৎপাদনে ব্যবহার করে খামার কর্তৃপক্ষ। সেই সার ব্যবহার হয় ঘাস চাষে। এছাড়া এ খামার থেকেই বায়োগ্যাস ও জৈবসার প্রস্তুতকারীদের গোবরের জোগান
দেয়া হয়।
খামারের হিসাবের বাইরে আরো ৪২টি প্রজনন ষাঁড় এআই ল্যাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ ল্যাব থেকে বছরে অন্তত সোয়া কোটি টাকার সিমেন উৎপাদন হয়।
রাজাবাড়ীহাট খামার থেকে শাহীওয়াল জাতের গরু কিনেছিলেন ফাহাদ
ইসলাম।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিন
মাস আগে চারটি গরু কিনেছি। গরুগুলোর রোগবালাই নেই বললেই চলে। শুধু আমি নই, বেশ কয়েকজন এ খামার থেকে গরু কিনেছেন। অনেকে খামার করেছেন। রাজশাহী অঞ্চলের আশীর্বাদ হয়েছে রাজাবাড়ীহাট ডেইরি উন্নয়ন খামার। এখন আমরা সহজেই উন্নত জাতের গরু পাই।’
রাজশাহীর ডেইরি সেক্টরের পরিচিত মুখ আরাফাত রুবেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজশাহীর
রাজাবাড়ীহাট ডেইরি উন্নয়ন খামার গরুর জাত উন্নয়নে বেশ ভূমিকা রাখছে। পাকিস্তান আমল থেকে এখানে শাহীওয়াল খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এটি সারা দেশে জাত ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক খামারি এখান থেকে গরু কিনে খামার শুরু করেছেন। বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ব্রাহমা ফ্রিজিয়ান হলস্টেইন বিভিন্ন জাতের গরু পালন করা হলে খামারিদের
বেশ লাভবান হওয়া সম্ভব। রাজাবাড়ীহাট ডেইরি উন্নয়ন খামারের অনেক বড় জায়গা রয়েছে। সেখানে ঘাস উৎপাদন, মুক্ত বিচরণভূমি, রয়েছে। ফলে সঠিকভাবে গরু পালন সম্ভব। আমরা খামারিরা এ খামারের কার্যক্রমে খুশি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে আমি শ্রেষ্ঠ খামারির পুরস্কার পেয়েছি। অবশ্যই এটি প্রাণিসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।’
চলতি বছরের শুরুতে রাজাবাড়ীহাট ডেইরি উন্নয়ন খামার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মান্দা উপজেলার দুলাল হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি
খামারের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান স্যারের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমার সঙ্গে আরো ৩০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণে আমরা গরু পালন এবং প্রজনন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছি। সারা বছর এখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আমি প্রশিক্ষণ পেয়ে খুবই উপকৃত হয়েছি।’
খামার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৫টি দুগ্ধবতী গাভীসহ খামারে গরু ছিল ৩২৩টি। ওই বছর এক লাখ ৩০ হাজার ৮২ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। বাছুরের খাবার হিসেবে দেয়া হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৮৫ লিটার দুধ। বাকি ৬৫ হাজার ১৯৭ লিটার দুধ বিক্রি হয়েছে। আয় হয়েছে ৩২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭৫ টাকা। ওই বছর ২৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকার গরু বিক্রি হয়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৮০টি দুগ্ধবতী গাভীসহ খামারে গরু ছিল ৩৪১টি। ওই বছর এক লাখ ৪৩ হাজার ৪৫১ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। বাছুরের খাবার হিসেবে দেয়া হয়েছে ৫৭ হাজার ১০৪ লিটার দুধ। বাকি ৮৬ হাজার ৩৪৭ লিটার দুধ বিক্রি হয়েছে। আয় হয়েছে ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ টাকা। ওই বছর ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ টাকার গরু বিক্রি হয়েছে।
সর্বশেষ চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ৭৮টি দুগ্ধবতী গাভীসহ খামারে গরু ছিল ৩৫৪টি। এই চার মাসে ৪৮ হাজার ৫৬৯ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। বাছুরের খাবার হিসেবে দেয়া হয়েছে ২১ হাজার ৫৭৪ লিটার দুধ। বাকি ২৬ হাজার ৯৯৫ লিটার দুধ বিক্রি হয়েছে। আয় হয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৫০ টাকা। ওই বছর ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ২০০ টাকার গরু বিক্রি হয়েছে।
উপপরিচালক ডা. আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, খামারে শতভাগ শাহীওয়াল বুলকাফ ও বকনা উৎপাদনের উদ্দেশ্য থাকলেও অধিকাংশ গাভী ক্রস। পিওর গাভী বা বকনা আমদানি করা গেলে এ উদ্দেশ্য সফল হবে।










