সুনামগঞ্জের ছাতকে ৩২ বছরের শারীরিক প্রতিবন্ধী মুহিবুর রহমান। অন্যের সাহায্যে দীর্ঘ ১০-১১ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করে কোনো মতে চলছিল তার সংসার। এছাড়া তার সংসারে আরো দুই ভাইবোন রয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদেরকেও দেখতে হয় তার। ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে করতেন ভিক্ষাবৃত্তি। গ্রামের মানুষ খারাপ চোখে দেখায় আত্মমর্যাদা রক্ষায় হঠাৎ একদিন মুহিবুর সিদ্ধান্ত নেন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে কাজ করে সংসারের হাল ধরার। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বণিক বার্তার সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি আল আমিনের সহযোগিতায় মুহিবুরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। মুহিবুরকে তার নিজ বাড়িতে একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। সেই দোকান দিয়ে ভালোভাবে চলছিল মুহিবুরের সংসার। হঠাৎ চলতি বছরের ভয়াবহ বন্যায় ভেসে যায় তার দোকানের মালপত্র। এর পরও ভিক্ষাবৃত্তিতে না গিয়ে পুনরায় দোকান দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি। মুহিবুর বলেন, পুনরায় দোকান চালু করতে পারলে ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তাই সবার মানবিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের নোয়াকোট গ্রামের আব্দুল মান্নানের বড় ছেলে মুহিবুর রহমানসহ তিন ছেলে তিন মেয়ে। এর মধ্যে তিন ছেলেমেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তারা হলেন মুহিবুর রহমানের ছোট ভাই মিজানুর রহমান (৩০) ও ছোট বোন রুকসানা (১৪)। মুহিবুর রহমান জন্মের পর হঠাৎ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যান। তার দুই পা অচল। জন্মের পর থেকে হাঁটতে পারেননি। চলতে হয় অন্যের সাহায্যে। অন্য ভাইবোনের মধ্যে এক বোনকে স্থানীয়দের সহায়তায় বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দুজন ছোট। বাবা আব্দুল মান্নান বয়সের ভারে উপার্জন ক্ষমতা হারিয়েছেন। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামেন মুহিবুর।

১০-১১ বছর ধরে সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করেছেন তিনি। সারা দিন ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে চলে সংসার।

মুহিবুর রহমান বলেন, জন্মগতই তিনি প্রতিবন্ধী। হাঁটতে পারেননি কখনো। বাবা আব্দুল মান্নান ছিলেন স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। ছোটবেলায়  সেখান থেকে কুরআন পড়া শিখেছেন। তিনি নিজ বাড়িতে শিশুদের কুরআন পড়ানোও শুরু করেন। কিন্তু হঠাৎ তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের ভার পড়ে তার ওপর। কিন্তু কুরআন পড়িয়ে যে টাকা পান তা দিয়ে চলত না সংসার। পরিবারে আরো দুই ভাইবোন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদের মুখে খাবার নেই। বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছিলেন। অনেক সময় চাচাতো ভাইদের সাহায্যে ভিক্ষা করে দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকা পেয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে কোনোমতে চলত সংসার। ভিক্ষা করতে গেলে অনেকে কটু কথা বলতেন। একদিন ভিক্ষা করতে গিয়ে সাংবাদিক আল আমিনের সঙ্গে পরিচয় হয়।  তিনি আমার কথা শুনে ভিক্ষাবৃত্তি বাদ দেয়ার শর্তে একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাস দেন। কয়েক মাস পর সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেন। এ দোকান দিয়ে কোনো মতে চলে সংসার।

তিনি আরো জানান, গত বন্যা আমার দোকানের মালপত্রসহ মূলধন সব নষ্ট করে দিয়েছে। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় বলেন, মুহিবুরের পরিবারে তিনজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদের আমরা প্রতিবন্ধী ভাতা দিচ্ছি। এছাড়া নানা সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে।