জয়পুরহাটের কৃষকরা ধানক্ষেতের পোকামাকড় দমনে কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে এখন লাইফ পার্চিং ও ডেথ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। দিন দিন জেলায় এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জেলার কৃষকরা কীটনাশকের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ব্যাপক সুফল পাচ্ছেন। এতে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে ক্ষেতে রোগবালাই কম হওয়ায় বাম্পার ফলনের সম্ভবনাও উঁকি দিচ্ছে।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলাসহ জেলার আক্কেলপুর, ক্ষেতলাল, পাঁচবিবি ও কালাই উপজেলার ৬৭ হাজার ৫২৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ ভাগ জমিতেই পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়েছে। ফলে জেলার ধানক্ষেতগুলোয় এখন সবুজের সমারোহ। বাতাসে দোল খাওয়া ধানক্ষেতের অপার সৌন্দর্য কৃষকের মনকে উদ্বেলিত করছে। লাইফ পার্চিং পদ্ধতির জন্য কৃষকরা বিঘাপ্রতি জমিতে ৮-১০টি ধনচে গাছ এবং ডেথ পার্চিংয়ের জন্য প্রতি বিঘা জমিতে ৮-১০টি মরা ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে দেন। ঝামেলামুক্ত এ পার্চিং পদ্ধতি প্রয়োগে স্থানীয় কৃষকরা সুফল পাচ্ছেন। ধনচে গাছ দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় এর ডালে বসে পাখি সহজেই ধানের মাজরা, ফুতি পোকাসহ ক্ষতিকর পোকাগুলো খেয়ে ফেলে। এতে পোকার বংশ বিস্তার রোধ হয়। অধিকন্তু, ধনচে গাছ জমিতে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে জমির উর্বরতা বাড়ায়। ডেথ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেও ক্ষেতে রোগবালাই মুক্ত রাখা যায়। ডেথ পার্চিং ও লাইফ পার্চিং দুটোই জৈবিক বালাই দমন পদ্ধতি হওয়ায় জমিতে তেমন কোনো কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। এসব পদ্ধতি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়ক। জেলায় অধিকাংশ জমিতে ধানের শিষ দেখা দিয়েছে। সবুজ ধানগাছ মৃদু বাতাসে দুলছে। বর্তমানে ধান ক্ষেতে রোগবালাই কম, ধানের আবাদও হয়েছে ভালো। এতে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে পার্চিং পদ্ধতির সুফল এরই মধ্যে কৃষকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। আগামীতে ধান ক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকামাকড় দমনে জৈবিক এ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ বাড়বে এমন আশা কৃষি বিভাগের।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার কৃষক শহিদুল ইসলাম, মামনুর রশিদ, রফিকুল ইসলাম ও মোজাম্মেল হক, ক্ষেতলাল উপজেলার কুসুম শহর গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম, শামিম ও বজলুর রশিদ, পাঁচবিবি উপজেলার আয়মা রসুলপুর গ্রামের কৃষক কুতুবুল আলম ও রফিক এবং কালাই উপজেলার কৃষক আনিসুর রহমান, আক্কেলপুর উপজেলার হান্তাবসন্ত গ্রামের কৃষক আজাহার আলী ও আব্দুল্লাহসহ অনেকে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে চলতি বোরো মৌসুমে তাদের জমিতে কীটনাশকের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক এ পদ্ধতি—লাইফ ও ডেথ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে রোগবালাই দমনে সফলতা পেয়েছেন। এতে পাখিরা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলায় বর্তমানে তাদের বোরো ক্ষেতে রোগবালাই কম। আর কীটনাশক ব্যবহার না করাতে এবার তাদের অনেক সাশ্রয়ও হয়েছে।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শ ম মিফতাহুল বারী বলেন, কম খরচে বোরো ধানের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে কীটনাশকের পরিবর্তে ডেথ পার্চিং ও লাইফ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। চাষী পর্যায়ে আমরা নিয়মিত সভা, উঠান বৈঠক, ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। কীটনাশক ব্যবহার না করেও যে ধানের বাম্পার ফলন পাওয়া যায়, তা কৃষকদের হাতেকলমে শিক্ষা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ায় এবং কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় আগামীতে লাইফ পার্চিং ও ডেথ পার্চিং পদ্ধতিতেই চাষাবাদে আরো আগ্রহ বাড়বে কৃষকদের।










