রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত অধিকাংশ চরই প্রকৃতিগতভাবে বালিময়। সেচের অভাবে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল অনাবাদি থাকত বছরের পর বছর। কালেভদ্রে কিছু কিছু এলাকায় ব্যক্তি-উদ্যোগে নদী থেকে পানি নিয়ে আবাদের চেষ্টা করা হয়। তবে কাজটি শ্রমলব্ধ ও ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় তেমন সুফল মেলেনি। কিন্তু তিন বছর ধরে ধারাবাহিক সৌরশক্তিচালিত ভ্রাম্যমাণ সমন্বিত সেচ ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি চরের চিত্র এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। চারদিকে সবুজের সমারোহ। উৎপাদিত পণ্য কিনতে প্রত্যন্ত চরগুলোয় দূরের পাইকারদের আনাগোনা বাড়ছে। কৃষকদের মাঝেও শুরু হয়েছে ফসলের বৈচিত্র্য আনার প্রতিযোগিতা।
সরেজমিনে কাউনিয়া উপজেলার চর তালুক শাহবাজ, ডুষমারা, হরিচরণশর্মা এবং চরগোনাই এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, আগে সেচের অভাবে একরের পর একর জমি অনাবাদি থাকত। কিন্তু এখন নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাস চরের জমিতে থাকছে মিষ্টি কুমড়া, স্কোয়াশ, আলু, মরিচ, ভুট্টা, বাদাম, পেঁয়াজ, রসুন এবং বিভিন্ন শাকসবজিতে ভরপুর। সৌরশক্তিচালিত ট্রলি ও নৌকা করে ভ্রাম্যমাণ সেচের মাধ্যমে প্রত্যন্ত চরের বেশকিছু জমিতে সেচ নিশ্চিত করায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফসল উৎপাদনে।
কৃষক মুক্তার আলী স্বাধীন বলেন, দীর্ঘদিন যাবত তিনি চরে আবাদ করেন। বালির পরিমাণ বেশি হওয়ায় প্রতিদিন জমিতে সেচ দিতে হয়। আগে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিস্তা নদী থেকে পানি নিয়ে কাঁধে করে জমিতে এনে গর্ত করে পলিথিন দিয়ে জমিয়ে রাখতেন। ওই পানি দিয়ে কোনো রকমে সেচের কাজ করতে হতো। আবার যদি ব্যক্তি পর্যায়ে বসানো মেশিনের পানি পাওয়া যেত তা দিয়ে আবাদ করলে উৎপাদন খরচ বেশি হতো। বর্তমানে তিনি সৌরশক্তিচালিত ভ্রাম্যমাণ ট্রলির মাধ্যমে সেচ নিয়ে আবাদের জমি প্রতি বছর বৃদ্ধি করছেন। এ বছর তিনি ব্যাপকভাবে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করেছেন। প্রায় ৪ হাজার পিট (গর্ত) করেছেন। প্রতি পিটে কুমড়ার গাছ আছে দুটি করে। লোক দিয়ে কাজ করায় প্রতি ফুটে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ টাকা। প্রতি পিট থেকে কুমড়া বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে তিনি ৫০-৬০ টাকা লাভ করার আশা করছেন। বর্তমানে দূর থেকে পাইকাররা চরে আসছেন মিষ্টি কুমড়া কিনতে। এছাড়া আলাদাভাবে এক একর জমিতে পেঁয়াজ, ভুট্টা ও রসুনের আবাদ করেছেন। অথচ আগে সেচের অভাবে ১ দোন (২৫ শতক) জমিতে আবাদ করতে পারতেন না।
এক দোন জমিতে ২৫০টি পিট করা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বছর চরের কৃষকরা শুধু মিষ্টি কুমড়ার জন্য প্রায় ১৪ হাজার পিট করেছেন। সৌরশক্তিচালিত ভ্রাম্যমাণ ট্রলিতে চাকা লাগা থাকায় দূরের কৃষকরাও জমিতে সেচ দিতে পারছেন।
কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন, এ বছর তিনি ১ একর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। এরই মধ্যে তিনি ১৬ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। বর্তমানে তার জমিতে আরো ২০ মণ পেঁয়াজ আছে। পেঁয়াজ
আবাদে খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকা।
কৃষক মো. দুলাল মিয়া বলেন, এ বছর আলু তুলে সাত দোন জমিতে বর্তমানে বাদাম চাষ করেছেন। তারা প্রত্যেকে নৌকায় বসানো সৌরশক্তিচালিত পাম্পের মাধ্যমে জমিতে প্রয়োজনীয় সেচ দিতে পারছেন। অথচ আগে সেচ বাবদ বছরে তাদের একরপ্রতি ৬ হাজার টাকা খরচ হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১ হাজার টাকায়। ট্রলির মতো তিস্তা নদী দিয়ে নৌকাকেও চরের দূরদুরান্ত পর্যন্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
একাধিক কৃষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) চর এলাকায় নৌকা ও ট্রলিতে করে সৌরশক্তি চালিত ভ্রাম্যমাণ এলএলপি সেচের ব্যবস্থা করেছে।
বিএডিসি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম মিজানুল ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলের ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে তিনটি ট্রলি, একটি নৌকার মাধ্যমে সৌরশক্তিচালিত ভ্রাম্যমাণ এলএলপি সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যন্ত চরে কৃষকের সেচ সুবিধার জন্য দুটি পাতকুয়া স্থাপন করা হয়েছে। নদীসংলগ্ন জমিগুলোয় ট্রলি এবং নৌকার মাধ্যমে সেচ দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি সেচ স্কিমে প্রায় ৩০ একর করে জমি সেচের আওতায় এসেছে। এ চরে বালির পরিমাণ বেশি হওয়ায় সবসময় সেচের প্রয়োজন হয়। তিনি আরো বলেন, চরের যেখানে খুব বড় বন্যা না হলে পানি ওঠে না এমন দুটি স্থান চিহ্নিত করে দুটি পাতকুয়া স্থাপন করা হয়েছে। আগে এসব চরে কাশবন ছিল। এখন শুধু চাষাবাদ নয়, বেশকিছু বাড়িঘর তৈরি হয়েছে।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, চরের জমিতে বালির পরিমাণ বেশি থাকায় কৃষকদের আবাদ করতে যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তার পরও তারা ফসলের বৈচিত্র্য আনার জন্য নতুন নতুন আবাদ শুরু করেছেন। এ বিষয়ে কৃষি বিভাগ কৃষকদের সবসময় পরামর্শ অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি বিএডিসি সৌরশক্তিচালিত ভ্রাম্যমাণ সেচের ব্যবস্থা না করলে কৃষকদের পক্ষে চাষাবাদ করা সম্ভব হতো না বলে তিনি দাবি করেন। এখনো অনেক জমি সেচের অভাবে অনাবাদী পড়ে আছে।
রংপুর বিএডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সঞ্চয় সরকার বলেন, কাউনিয়া উপজেলার চারটি চরের ২ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে ছয়টি সেচ স্কিমের মাধ্যমে আমরা প্রায় ৮০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনতে পেরেছি। সুবিধাভোগী কৃষকের সংখ্যা তিন শতাধিক। বর্তমানে আরো কৃষক এ স্কিমের আওতায় আসার জন্য যোগাযোগ করছেন। আগামীতে প্রকল্প শুরু হলে তাদের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।










