দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে অবস্থিত। ৭১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে জাপানের জ্বালানি খাতের বৃহৎ কোম্পানি জাপান’স এনার্জি ফর নিউ এরা (জেরা) কোম্পানি ইনকরপোরেটেড। কেন্দ্রটি জেরা মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের (জেএমপিএল) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অবকাঠামো উন্নয়ন, এলএনজি সরবরাহ এবং ভবিষ্যতে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বড় বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে জেরার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের মধ্যেই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে বুধবার পেট্রোবাংলার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে জেরা।

শিল্প উদ্যোক্তা ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি আমদানিকারক এবং জাপানের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেরা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। তাদের মতো বৃহৎ বৈশ্বিক কোম্পানির বিনিয়োগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি অন্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও এ খাতে আগ্রহী করে তুলতে পারে।

জ্বালানি খাতে সহযোগিতা নিয়ে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর জেরার প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, এর আওতায় সম্ভাব্য এলএনজি সরবরাহ, সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ খতিয়ে দেখবে দুই পক্ষ। পেট্রোবাংলার সঙ্গে এসব সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে এলএনজি সরবরাহের পুরো মূল্যশৃঙ্খল এবং বিদ্যুৎ খাতে জেরার বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানো হবে। দুই পক্ষের আলোচনা ও গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলেও জেরার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চারদিনের সরকারি সফরের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জাপানের চিবা প্রদেশের ফুতসু এলাকায় জেরার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

aee

বাংলাদেশ শুধু এলএনজিসহ জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে না, বরং জ্বালানি সংগ্রহের পর দেশের অভ্যন্তরে তা দক্ষতার সঙ্গে বিতরণ নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে জাপানের সরকারি সংস্থা জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের প্রধান ও জাপান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) কাজুইকি কাতাওকা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জেরা অবশ্যই আগ্রহী। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে মেঘনাঘাটে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার প্রতিনিধি দল চিবা প্রিফেকচারে জেরার একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থাপনা পরিদর্শন করছেন। আশা করি, এ সফর দুই পক্ষের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আরো বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।’

বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে গ্যাসের ঘাটতি সবচেয়ে প্রকট। দেশে চাহিদার তুলনায় দৈনিক গ্যাস সরবরাহে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। আমদানির মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতা এখন পর্যাপ্ত নয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় অন্যতম বৃহৎ সরবরাহকারী কাতার থেকেও এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বৈশ্বিক বৃহৎ কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা।

শিল্প উদ্যোক্তা ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনাল জেরার আগ্রহ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ ধরনের বৃহৎ জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণে তাদের মতো কোম্পানি প্রয়োজন। এ খাতে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাছাড়া মাতারবাড়ীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে তাদের আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ঠিক রেখে জেরার সঙ্গে সরকার এ ধরনের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে।’

দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ দরকার। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জ্বালানির টেকসই অবকাঠামো নির্মাণও গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও অবকাঠামোর বিকল্প কিছু নেই। বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে দেশের জ্বালানি খাতে জেরার মতো বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি আগ্রহ দেখালে তা ইতিবাচকভাবে নেয়া উচিত। দেশে ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনালে জেরার আগ্রহ রয়েছে। এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে দেশের গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদে সুফল দেবে। সেই সঙ্গে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহেও সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া জেরার মতো কোম্পানি আসলে দেশের অফশোর ও অনশোরে পর্যায়ক্রমে আরো বিদেশী কোম্পানিও আগ্রহ দেখাবে।’

জ্বালানিসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের ল্যান্ডবেইজ টার্মিনাল নির্মাণে ২০১৯ সাল থেকে জেরাসহ জাপানের বেশ কয়েকটি কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছিল। মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেইজ টার্মিনাল, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করলে জেরা থেকে অন্তত সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসার সুযোগ রয়েছে।

দেশে জেরার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রতিষ্ঠানটি বছরে বিপিডিবির কাছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতে জাপানি কোম্পানির পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও ভারতের বড় কোম্পানিরও বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বিদেশী বিনিয়োগ দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার তৈরি করছে; একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি নিশ্চয়তার সুযোগও বাড়াচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিডিবির শীর্ষ এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎ খাতে জেরার বিনিয়োগ রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে তারা। বিদ্যুৎ উৎপাদন এমনকি জ্বালানি খাতে বিদেশী কোম্পানি বিনিয়োগ করলে সেটা দেশের জ্বালানি খাতের টেকসই পরিস্থিতি তৈরি করবে।’

জেরার ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ২২ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে তারা। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জেরা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি কোম্পানি এবং জাপানের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী। বর্তমানে জাপানের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে জেরা। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি ক্রেতাদের অন্যতম। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন, এলএনজি প্রকল্পে বিনিয়োগ, জ্বালানি সংগ্রহ ও পরিবহন এবং বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন—পুরো জ্বালানি মূল্যশৃঙ্খলজুড়ে কার্যক্রম রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। জাপানে জেরার প্রায় ৭০ হাজার মেগাওয়াট এবং জাপানের বাইরে বিভিন্ন দেশে আরো প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।