ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া অভিবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। দুঃসাহসিক এ যাত্রায় শুধু চলতি বছরেই পৌঁছেছেন ১৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশী, যেখানে ২০২১ সালে গেছেন ৭ হাজার ৮৩৮ জন। সে হিসাবে আগের বছরের তুলনায় ইউরোপের দেশটিতে সমুদ্রপথে বাংলাদেশী যাওয়ার হার বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের প্রথম ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) সমুদ্রপথে ইতালি অভিবাসী হয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৪৩ জন। এর মধ্যে ১৫ শতাংশই গেছেন বাংলাদেশ থেকে। ২০২১ সালে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ৬২ হাজার ৯৪৩ জন অভিবাসী হয়েছিলেন, যাদের ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশই বাংলাদেশী। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে গত বছর ইতালি অভিবাসী হয়েছিলেন ৭ হাজার ৮৩৮ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যুঝুঁকির এ অভিযাত্রায় পা বাড়িয়েছেন ৭৮ দশমিক ৯৭ শতাংশের বেশি বাংলাদেশী, যেখানে গড় প্রবৃদ্ধি ৫০ শতাংশের কম।

সমুদ্রপথে ইতালি যাত্রার দিক থেকে বাংলাদেশীদের চেয়ে এগিয়ে আছেন কেবল মিসরীয় ও তিউনিসিয়ানরা। চলতি বছর ইতালি অভিবাসী হওয়াদের মধ্যে ২১ শতাংশ মিসরীয়, আর ১৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ গেছেন বাংলাদেশ থেকে। শীর্ষ দশে থাকা অন্য দেশগুলো হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া (৮ শতাংশ), আফগানিস্তান (৭ শতাংশ) ও আইভোরি কোস্ট (৫ শতাংশ)। এর বাইরে আফ্রিকার দেশ গিনি থেকে গেছেন ৪, ইরান থেকে ২, ইরিত্রিয়া থেকে ২ শতাংশ অভিবাসী।

মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে থাকা ভারতীয়দের নাম নেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি অভিবাসী হওয়াদের শীর্ষ তালিকায়। যদিও বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশটির জনসংখ্যা আট গুণেরও বেশি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ছাড়া এ অঞ্চলের অন্য কোনো দেশের নাম এ তালিকায় নেই। আবার শীর্ষ দশে থাকলেও পাকিস্তান থেকে চলতি বছর সমুদ্রপথে ইতালি গেছেন মাত্র ২ হাজার ৭০৫ জন। মোট অভিবাসীদের মধ্যে যা কেবল ৩ শতাংশ। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে সমুদ্রপথে ইতালি অভিবাসী হয়েছেন ৬ হাজার ৮০৯ জন, যা বাংলাদেশীদের অর্ধেকেরও কম।

ভৌগোলিকভাবে মিসর ও তিউনিসিয়া ইউরোপের প্রান্তসীমায়। তাদের মত্স্যজীবীদের নৌকা ও জাহাজ নিয়মিতই ওই পথে চলাচল করে। ফলে নিজেদের সমুদ্রসীমা পাড়ি দিয়েই দেশ দুটির নাগরিকরা ইউরোপ পৌঁছে যান। অন্যদিকে ইতালি বা ভূমধ্যসাগর উপকূল থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার মাইল। এ অবস্থায় বাংলাদেশীরা প্রথমে লিবিয়া যান। সেখান থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশের যাত্রাটিকে বিপজ্জনক ও দুঃসাহসিকই বলতে হয়। কেননা এটিকে অবধারিতভাবে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার পর্যায়েই পড়ে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বাংলাদেশের তুলনায় সিরিয়া, ইরানসহ আফ্রিকার দেশগুলো থেকে ইতালি যাত্রা অনেক সহজ। এমনকি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকেও তুলনামূলক সহজ ইতালি যাত্রা। অথচ এসব দেশের নাগরিকরাও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ায় বাংলাদেশীদের চেয়ে পিছিয়ে। প্রায় দুই দশক ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অর্থনীতিও ভঙ্গুর। তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণ ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে দেশটির নাগরিকরা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে। সেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এ সময় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কেন বাংলাদেশীরা ইতালি অভিবাসী হচ্ছেন, সেটি খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

দেশে কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তার কারণেই মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশীরা অভিবাসী হচ্ছেন বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সিআর আবরার। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এ নির্বাহী পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি যেতে গিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক বাংলাদেশী সাগরে ভেসে গেছেন। দুর্গম মরুভূমি কিংবা জঙ্গল পাড়ি দিতে গিয়েও অনেকের মৃত্যুর খবর আমরা শুনছি। লিবিয়ায় অনেক বাংলাদেশীকে আটকে রাখা এবং হত্যা করার সংবাদও আসছে। এর পরও বাংলাদেশীদের মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অভিবাসী হওয়ার প্রবণতা কমেনি। মূলত চাকরি ও জীবিকার সন্ধানেই তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হলেও অভিবাসী হচ্ছেন।’

সিআর আবরার বলেন, ‘দেশে উন্নয়ন হলেও তরুণদের চাকরির সংস্থান হচ্ছে না। পুলিশ কনস্টেবল হতে গেলেও বিপুল অংকের ঘুস দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাই মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অবৈধপথে ইউরোপ যাচ্ছেন। সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের প্রভাবে এ ধরনের অভিবাসন বন্ধ হচ্ছে না। উল্টো দুষ্টচক্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি দিনদিন আরো বাড়ছে। তবে অবৈধ এ অভিযাত্রা থামাতে হবে।’

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি অভিযাত্রা চলতি বছর রেকর্ড ছুঁয়েছে। ২০১৮ সালে অবৈধপথে দেশটিতে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১১ জন। ২০১৯ সালে এটি ১০ হাজারে নেমে আসে। এরপর ২০২০ সালে সংখ্যাটি ৩২ হাজার ৫৬৩-তে দাঁড়ায়। ২০২১ সালে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি অভিবাসী হয়েছেন ৬২ হাজার ৯৪৩ জন। আর চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্তই দুঃসাহসী অভিযাত্রীর সংখ্যা ৯৪ হাজার ৩৪৩-এ উন্নীত হয়েছে। এক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় ইতালি অভিবাসীর গড় প্রবৃদ্ধি ৪৯ শতাংশের বেশি।

অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালিগামীদের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে বাংলাদেশী অভিবাসীদের হার অবশ্য প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৭ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি অভিবাসী হয়েছিলেন ৯ হাজার ৯ জন। এরপর সংখ্যাটি কমে আসে; ২০১৮ সালে ৩৪৯ জন ও ২০১৯ সালে ৬০২ জন গিয়েছিলেন। ২০২০ সালে আবার তা বেড়ে ৪ হাজার ১৪১-তে দাঁড়ায়। এরপর থেকে এ ধরনের অভিযাত্রার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ২০২১ সালে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া বাংলাদেশীদের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৮৩৮ জন। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্তই ১৪ হাজার ২৮ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি গেছেন।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, চলতি বছর ইতালি যাওয়ার জন্য সমুদ্র পাড়ি দিতে ৫১ শতাংশই ব্যবহার করছেন লিবিয়া উপকূলকে। আর তিউনিসিয়া উপকূল হয়ে ২৯ শতাংশ এবং তুরস্ক হয়ে ইতালি গেছেন ১৬ শতাংশ। লেবানন, আলজেরিয়া, সিরিয়াসহ অন্যান্য আরব ও আফ্রিকান দেশ ব্যবহার করছেন অল্পকিছু অভিবাসী। তবে বাংলাদেশীদের ইতালি যাত্রার ক্ষেত্রে লিবিয়া উপকূল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ইতালি প্রবাসী ইকবাল আহমেদ জানান, প্রায় ছয় মাসের যাত্রা শেষে তিনি ইতালি পৌঁছতে পেরেছেন। ঢাকা থেকে প্রথমে দুবাই হয়ে লিবিয়া গেছেন। এরপর দীর্ঘ মরুপথ ও জঙ্গল পায়ে হেঁটে সমুদ্র উপকূলে পৌঁছেছেন তিনি। সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে দুই দফায় ব্যর্থ হয়ে লিবিয়ায় ফিরে এসেছেন। তৃতীয় দফায় তিনিসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২০ জন ইতালি পৌঁছতে পেরেছেন। বাংলাদেশ থেকে দালাল চক্রের সদস্যদের সঙ্গে ২০ লাখ টাকায় ইতালি পৌঁছানোর চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।

অবৈধ পথে নাগরিকদের অনুপ্রবেশ নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। অবৈধ বাংলাদেশীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যও তাগিদ দিচ্ছে দেশগুলো। এরই মধ্যে কিছু বাংলাদেশীকে ফেরতও আনা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পাদিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) চুক্তির আলোকে সরকারকে এটি করতে হচ্ছে।

ইউরোপের সেনজেনভুক্ত ২৬টি দেশেই অবৈধ বাংলাদেশী রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আবার কয়েক বছর ধরে পশ্চিম বলকান অঞ্চলের দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জঙ্গল দিয়ে বাংলাদেশীদের ইউরোপযাত্রার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। তীব্র শীতের মধ্যে দেশটির জঙ্গলে বাংলাদেশীদের আটকে পড়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। বসনিয়ায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) অভ্যর্থনা কেন্দ্রে প্রায় আড়াই হাজারের মতো অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসনপ্রত্যাশী অবস্থান করছেন। তাদেরও ফেরত আনতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। লিবিয়ায় বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে শত শত বাংলাদেশী নাগরিক আটক রয়েছে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংবাদ বেরিয়েছে।

বিদেশ গেলে বড় লোক হয়ে যাবেন—এ ধারণাই শিক্ষিত তরুণদের দুঃসাহসিক ইউরোপযাত্রায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে চাকরির অভাব আছে এটি সত্য। তবে দেশে গরিব ও অশিক্ষিতদের চাকরির অভাব নেই। তারা একটা না একটা কাজ পাবেই। শিক্ষিত এমএ-বিএ পাস—এ শ্রেণীর চাকরির খুব অভাব। সবাই চাকরি চান কিন্তু নিজে উদ্যোক্তা হতে চান না। আর ভাবেন বিদেশে গেলে তারা হয়তো বড়লোক হয়ে যাবেন। কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই বড়লোক হয়ে যাচ্ছেন। এর একটা প্রভাব অন্যদের ওপর পড়ছে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি বলেই মনে হয়। ভারতে প্রবণতা এতটা নেই। ভারতীয়রা মনে করে সুযোগ পেলে যাব, অন্যথায় নয়। আর আমাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় সুবিধা-অসুবিধা বিষয় না, যেতেই হবে। অন্য কোনো দেশে এমন প্রবণতা দেখা যায় না। ইতালিতে আন্ডার এজ বা ১৮ বছরের নিচে বাংলাদেশীদের সংখ্যা সর্বোচ্চ। এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য পরিবারসহ সবাইকে বুঝতে হবে যে, বিদেশ যাওয়ার অর্থই সুদিন না। কারণ যারা দেশে আছেন তারা খুব খারাপ করছেন এমনটা নয়। কিছু লোক বিদেশে গিয়ে অ্যাসাইলাম পাওয়ার জন্য দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’

তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সরকার বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে বলে জানান ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, ‘তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। এটা আমাদের ওপরে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য আমরা বিনিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছি। বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান বাড়বে। অন্যদিকে বাণিজ্যও বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্য দেশে ভালো হলে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাটা কমবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশীরা ১০৫ কোটি ৪২ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এর আগের অর্থবছরে তারা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন ৮১ কোটি ডলার।