দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি)। বেশকিছু কোম্পানিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিনিয়োগের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও আইসিবির উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া অস্তিত্বহীন কোম্পানি যেমন আছে, তেমনি শীর্ষস্থানীয় ভালো কোম্পানিও রয়েছে। এ ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ বিনিয়োগ ও পর্ষদে উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক এড়াতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইসিবির তথ্যানুসারে, দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মূল প্লাটফর্মে তালিকাভুক্ত ৩১টি কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিনিয়োগের পাশাপাশি পর্ষদেও উপস্থিতি রয়েছে। কোম্পানিগুলো হচ্ছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিএটিবিসি), ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ইউপিজিডিসিএল), গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) বাংলাদেশ লিমিটেড, ন্যাশনাল টি, এপেক্স ট্যানারি, এপেক্স ফুটওয়্যার, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, দি একমি ল্যাবরেটরিজ, আরএসআরএম, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আজিজ পাইপস, কে অ্যান্ড কিউ বাংলাদেশ, মেঘনা সিমেন্ট মিলস, গোল্ডেন সন, বিডি ওয়েল্ডিং, সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ, আরামিট সিমেন্ট, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস, ওয়াটা কেমিক্যালস, ম্যাকসন্স স্পিনিং মিলস, ন্যাশনাল পলিমার, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, আরামিট লিমিটেড, দ্য পেনিনসুলা চিটাগং ও হাক্কানী পাল্প অ্যান্ড পেপার লিমিটেড। তাছাড়া ওটিসিতে থাকা পারফিউম কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ও জাগো করপোরেশনেও আইসিবির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিনিয়োগ ও পর্ষদে উপস্থিতি রয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ অ্যারোমা টি লিমিটেড, ওরিয়ন পাওয়ার রূপসা লিমিটেড এবং ওয়েব লিংক লিমিটেডেও বিনিয়োগের পাশাপাশি পর্ষদে উপস্থিতি রয়েছে আইসিবির।
দীর্ঘদিন ধরেই এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ ধরে রেখেছে আইসিবি। এর মধ্যে অলটেক্স, গোল্ডেন সন, বিডি ওয়েল্ডিং ও আরামিট সিমেন্ট জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি হওয়ার কারণে চাইলেই এসব শেয়ার বিক্রি করতে পারছে না আইসিবি। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া ওটিসিতে থাকা কোম্পানি পারফিউম কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ও জাগো করপোরেশনের শেয়ারও উপযুক্ত ক্রেতার অভাবে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তারল্য সংকটে থাকা আইসিবির জন্য এসব মন্দ কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখা কিংবা এদের পর্ষদে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এসব কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ নতুন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা সম্ভব। তাছাড়া অন্য যেসব লাভজনক কোম্পানির শেয়ারে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ রয়েছে সেগুলো অনেক দিনের। ফলে এসব শেয়ার কতদিন ধরে রাখা হবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কারণ কার্যকর ও দক্ষতার সঙ্গে তহবিল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব।
লোকসানি কোম্পানিগুলোতে আইসিবির উপস্থিতির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের অবস্থান হচ্ছে যে এসব কোম্পানিকে নার্সিং করে অবস্থার পরিবর্তন করতে পারলে সেটি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক। তবে ওয়াটা কেমিক্যাল ছাড়া ওটিসিতে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি আইসিবি।
গত বছর বিডি ওয়েল্ডিংয়ে থাকা আইসিবির ২৫ দশমিক ২৬ শতাংশ শেয়ার আলিফ গ্রুপের কাছে বিক্রি করা নিয়ে জটিলতায় পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিধিনিষেধ থাকার কারণে এখন পর্যন্ত শেয়ার বিক্রির অনুমোদন পায়নি আইসিবি।
তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির পর্ষদে আইসিবির উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও পর্ষদে উপস্থিতির বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারধারী পরিচালক শাকিল রিজভী বণিক বার্তাকে বলেন, এসব কোম্পানিতে আইসিবির বিনিয়োগ এবং পর্ষদে উপস্থিতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিকই রয়েছে। ইতিবাচক দিক হচ্ছে পর্ষদে আইসিবির উপস্থিতি থাকলে তারা কোম্পানির পারফরম্যান্স ভালো করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে যেহেতু অনেকগুলো কোম্পানির পর্ষদে আইসিবির কর্মকর্তাদের উপস্থিতি রয়েছে এবং একই সঙ্গে তারা পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনাবেচা করে, তাই কোম্পানির মূল্যসংবেদনশীল তথ্যের অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। কোম্পানিতে কতদিনের জন্য বিনিয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে আইসিবির একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। এছাড়া তারল্য সংকটে যাতে পড়তে না হয়, সেজন্য সব সময় একটি আপত্কালীন তহবিল সংরক্ষণ করতে হবে আইসিবিকে। সংস্কারের মাধ্যমে আইসিবিকে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় আরো কার্যকারভাবে কাজে লাগানো সম্ভব এবং এক্ষেত্রে সব স্টেকহোল্ডারের মতামত বিবেচনায় নেয়া হলেও সেটি আরো কার্যকর হবে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও আইসিবির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট নয়। পুঁজিবাজারে ভূমিকা রাখার স্বার্থে যেসব কোম্পানিতে আইসিবির উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও পর্ষদে উপস্থিতি রয়েছে সেক্ষেত্রে ঘোষণা ছাড়াই পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ দিয়েছে কমিশন। এমনকি নিষিদ্ধ সময়েও (কোম্পানির হিসাব বছর শেষ হওয়ার এক মাস আগে থেকে পর্ষদে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন হওয়ার আগ পর্যন্ত) আইসিবিকে শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হলেও পুঁজিবাজারের স্বার্থে কমিশন আইসিবিকে এসব বিষয়ে ছাড় দিয়েছিল। অথচ তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। সম্প্রতি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদে থাকা আইসিবির পরিচালকদের দায়সারা ভূমিকার বেশকিছু ঘটনা কমিশনের নজরে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে বিএসইসি।
জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আইসিবি তার ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি তারা প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো ঋণও বিতরণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সংস্কারে সম্প্রতি পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। পরামর্শক তাদের প্রতিবেদন জমা দিলে তা পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হবে। আইসিবির সংস্কারও হবে সেটির আলোকেই।










