মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরো প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন। এসএমই ফাউন্ডেশনের রিভলভিং তহবিল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হবে।
একজন উদ্যোক্তা সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। অর্থ বিভাগের নতুন পরামর্শ মোতাবেক এ ঋণের সুদের হার হবে ৮ শতাংশ। এ লক্ষ্যে ১৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তির আওতায় দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদেরকে ৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শতকরা ৯ ভাগ সুদে ১৪৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন। এ প্রকল্পে একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন অংশীদার ১১টি ব্যাংক ও ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্স।
এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমানের সভাপতিত্বে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক পর্ষদ সদস্য নাসরীন ফাতেমা আউয়াল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার। স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন দফতরের অনুমোদন প্রাপ্তি সহজ করবে সরকার।
তিনি বলেন, দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশনকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেবে সরকার। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আমাদের শিল্পখাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক, সহনশীল এবং উদ্ভাবনমুখী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্য অর্জনে এমএসএমই খাতের জন্য সহজ শর্তে এবং সময়োপযোগী অর্থায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ রিভলভিং ফান্ডভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে, বিদ্যমান উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবে এবং দেশে আরও কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অংশীদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণের বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। তবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কোন জামানত গ্রহণ করা হবে না। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা হবে সর্বোচ্চ ৪ বছর। গ্রাহক-ব্যাংক সম্পর্কের ভিত্তিতে ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪৮টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। মোট ঋণের ২৫ শতাংশ নারী-উদ্যোক্তাদের মাঝে এবং ২০শতাংশ এসএমই ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। ন্যূনতম ৩০শতাংশ তহবিল ১০ লাখ টাকা বা তার নিচে পরিমাণের ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে হবে। ন্যূনতম ৬০শতাংশ উৎপাদনখাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে, অবশিষ্ট তহবিল সেবা খাত ও ভ্যালু চেইন খাতে বিতরণ করতে হবে। তবে ভ্যালুচেইন খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি হবে না।
ঋণ প্রাপ্তির খাতসমূহ:
১. অগ্রাধিকারভুক্ত এসএমই সাব-সেক্টর, ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা এবং ভ্যালু চেইনের আওতাভুক্ত উদ্যোক্তা
২. রফতানিযোগ্য পণ্যসহ ‘আমদানি-বিকল্প পণ্যের’উৎপাদনে নিয়োজিত উদ্যোক্তা
৩. আইসিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল ব্যবসায়ে যুক্ত তরুণ/নতুন উদ্যোক্তা যারা এখনো ব্যাংক হতে ঋণ পাননি
৪. সারা দেশের নারীউদ্যোক্তা
৫. পশ্চাৎপদ অঞ্চল, উপজাতীয় অঞ্চল, শারীরিকভাবে অক্ষম এবং তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা
৬. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের উদ্যোক্তা, সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ এবং বিশেষ খাতভুক্ত উদ্যোক্তা
৭. উৎপাদনশীল ও সেবা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী বিদেশ ফেরত অভিবাসী উদ্যোক্তা
৮. দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ট্রেডবডি, এসএমই অ্যাসোসিয়েশন, নারী-উদ্যোক্তা সংগঠন, নাসিব, উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সরকারী-বেসরকারী সংস্থাসহ উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সুপারিশ করা উদ্যোক্তা।
ফাউন্ডেশন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম নিয়মিতভাবে মনিটরিং করবে। ঋণ বিতরণের পর এসএমই ফাউন্ডেশনের নিজস্ব পদ্ধতি ও লোকবল দ্বারা সরেজমিন পরিদর্শন করে চুক্তি অনুযায়ী এবং সঠিক উদ্যোক্তার অনুকূলে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে কি-না তা যাচাই ও নিশ্চিত করবে। তবে অনুৎপাদনশীল খাত যেমন, মুদি দোকান, ঔষধ বিক্রেতা, হার্ডওয়্যার বিক্রেতা এবং পরিবেশ দূষণ ঘটায় এমন ব্যবসার অনকূলে এ কর্মসূচির আওতায় ঋণ দেয়া যাবে না।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১২ হাজার সিএমএসএমই উদ্যোক্তার মাঝে ১১শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন।










