চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে রেল ক্রসিং পার হতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসে থাকা ১১ জন আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল বেলা ১টা ৪০ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের খৈয়াছড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় আরো ছয়জন আহত হন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
মাইক্রোবাসের যাত্রীরা হাটহাজারী জুগিরহাট আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টার থেকে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনায় গিয়েছিলেন। ঝরনা থেকে ফিরে আসার সময় বেলা ১টার দিকে উপজেলার পূর্ব খৈয়াছড়া গ্রামের ঝরনা এলাকার রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর বিকালে গেটম্যান সাদ্দামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন মাইক্রোবাস চালক গোলাম মোস্তফা নিরু, মোহাম্মদ হাসান, জিয়াউল হক সজীব, ওয়াহিদুল আলম জিসান, মোসহাব আহমেদ হিসাম, মোস্তফা মাসুদ রাকিব, রিদুয়ান চৌধুরী, সাগর, ইকবাল হোসেন মারুফ, আয়াতুল ইসলাম আয়াত ও সামিউল ইসলাম।
আহতরা হলেন তাসমির হাসান, মাইক্রোবাসের হেলপার তৌহিদ ইবনে শাওন, মাহিম, সৈকত, ইমন ও তানভীর হাসান হূদয়। নিহত ও আহতদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন হাটহাজারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সফিকুল আলম।
জানা গিয়েছে, খৈয়াছড়া এলাকায় আহত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালের ২৪ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। চমেক হাসপাতালে জেলা পুলিশের দায়িত্বরত এএসআই আলাউদ্দিন তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, মিরসরাইয়ে ট্রেনের ধাক্কায় ১১ জন নিহত হলেও চমেক হাসপাতালে আহত অবস্থায় ছয়জনকে ২৪ ও ২৮ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, দুর্ঘটনার ৪ ঘণ্টা পর বিকাল ৫টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। রেল চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করে বড়তাকিয়া স্টেশনমাস্টার মো. শামসুদ্দোহা বলেন, প্রায় ৩ ঘণ্টা চেষ্টা করেও মাইক্রোবাসটি সরাতে ব্যর্থ হন মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মীরা। পরে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের দুটি টিম এসে মাইক্রোবাসটি উদ্ধার করার পর পুনরায় রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী এজেএম আলমগীর জানান, বিকট শব্দ শুনে ছুটে এসে দেখেন একটি মাইক্রোবাসকে মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেস টেনে নিয়ে যাচ্ছে। খৈয়াছড়া রেল গেট থেকে মাইক্রোবাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়ে ট্রেনটি পূর্ব খৈয়াছড়া এলাকায় থামে। এ সময় ট্রেন ও মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে চিত্কারের শব্দ শোনা যায়। পরে এলাকার লোকজনকে নিয়ে ১১ জন পর্যটকের লাশ উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের দায়িত্বে থাকা সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ডিফেন্সের সিনিয়র কর্মকর্তা নুরুল আলম দুলাল জানান, খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকাজে মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট কাজ করেছে। পরে আগ্রাবাদের একটি টিম উদ্ধারকাজে যোগ দেয়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন জানান, শুক্রবার বিকালে গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
নিহতরা সবাই পর্যটক ছিলেন উল্লেখ করে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান জানান, গেটম্যানের দায়িত্বে কোনো অবহেলা ছিল কিনা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মাইক্রোবাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভাগীয় ট্রাফিক কর্মকর্তা (ডিটিও) মো. আনছার আলীকে এতে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটি প্রসঙ্গে আনছার আলী জানান, কমিটির মাধ্যমে ঘটনাটির বিষয়ে তদন্ত করা হবে। তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে না দিলেও যত দ্রুত সম্ভব রিপোর্ট দাখিল করা হবে। এরই মধ্যে তদন্ত কাজ শুরু করেছি। চেষ্টা করছি তিন-চারদিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী-১ আবদুল হামিদ, বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (লোকো) জাহিদ হাসান, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট রেজানুর রহমান এবং বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার (ডিএমও) মো. আনোয়ার হোসেন। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।










