স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, নতুন করে আরো সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম ও এর উপসর্গে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আরো ৫৯৭ শিশুকে। এছাড়া নতুন করে ১৮০ শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট করে তুলছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সহজেই একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মৃত্যুর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশুদের নিয়ে চরম উদ্বেগে আছেন অভিভাবকরা। সরকার থেকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ডা. তাসনিম জারা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক এ যুগ্ম সদস্য সচিব গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘হামের উপসর্গ দেখা দিলে অভিভাবকরা বুঝতে পারছেন না কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন—জ্বর এলেই, নাকি র‍্যাশ ওঠার পর। কোথায় যাবেন; উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, নাকি জেলা হাসপাতালে সেটিও পরিষ্কার নয়। এমনকি আক্রান্ত শিশুকে বাসায় আইসোলেশনে রাখবেন, নাকি হাসপাতালে নিয়ে যাবেন এ সিদ্ধান্ত নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন এ দিতে হাসপাতালে নিলে সেখান থেকে অন্য শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে অভিভাবকরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরছেন, যা সংক্রমণ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। এবারের হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমাদের জনস্বাস্থ্য কাঠামো কতটা ভঙ্গুর।’

jam

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক দিনে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কসংকেত। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সব শিশুকে আনা না গেলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। সরকার যদিও জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অনীহা বা ভুল ধারণার কারণে শিশুরা টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবারই সতর্ক করে বলছে, হামের টিকা একটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তাই প্রতিটি শিশুকে নির্ধারিত সময়ে টিকা দেয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এই দিনে বিশেষজ্ঞদের আহ্বান—শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ একটি সুস্থ প্রজন্মই পারে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একই সময়ে ‘সন্দেহজনক হাম’ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরো পাঁচ শিশু। এছাড়া সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৯৭ শিশু। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ শিশুর দেহে।

এদিকে নতুন করে ‘সন্দেহজনক হাম’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগীও ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ সংখ্যা ২৩৮। এরপর রয়েছে যথাক্রমে রাজশাহী (৯১), চট্টগ্রাম (৮৭), খুলনা (৬৩), সিলেট (৩৭), রংপুর (৩০), বরিশাল (২৯) ও ময়মনসিংহ (২২)। সন্দেহজনক হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ৬১৪ শিশুকে ছুটিও দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৮৫ ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১১৩ শিশু হাসপাতাল ছেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৩ দিনে হামে মোট ২০ শিশু মারা গেছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৮ শিশুর। এখন পর্যন্ত মোট হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৯৯। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে ১ হাজার ২৮২ জন হাসপাতালে এসেছে। এ নিয়ে গত ২৩ দিনে হাসপাতালে আসা ৮ হাজার ৫৩৪ জনের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ৯৪০ জন। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে ৬ হাজার ১৬ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম কিংবা এর উপসর্গে মোট ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ২০ জন। আর ছাড়পত্র পেয়েছে পাঁচজন। সাসপেক্টেড হামে চিকিৎসাধীন ভর্তি রোগী ১৩৮ জন। এখন পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৪১১ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে ৪২ শিশুর।

সিলেট বিভাগে এ পর্যন্ত মোট ৩৭ রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিলেটে এটিই প্রথম মৃত্যু। অন্যদিকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১০১ সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির জানান, দুইদিন আগে হাম ও হৃদযন্ত্রের জটিলতা নিয়ে শিশুটিকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। গতকাল দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

দেশে গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার কোনো টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত না হওয়ায় বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সংকট মোকাবেলায় গত রোববার দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। গতকাল জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।

আগের সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চার বছর পরপর হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও গত সাড়ে পাঁচ বছর তা হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে টিকার মজুদে মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছিল, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।’

টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রী সংসদকে জানান, প্রথম ধাপে ১৮টি জেলা এবং ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম দিনে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬ হাজার শিশু, যার মধ্যে ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম দিনেই ৯৬ শতাংশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।

চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রস্তুতি তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, টিকার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের অন্ধত্ব ও শারীরিক জটিলতা রোধে ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাজশাহী হাসপাতালে নতুন করে ২৫০টি আইসোলেশন বেড স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া আইসিডিডিআর,বির উদ্ভাবিত মাত্র ৩০০ টাকা ব্যয়ের সাশ্রয়ী অক্সিজেন সিস্টেমের মাধ্যমে ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে হামের প্রকোপ শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও সচেতনতাজনিত চ্যালেঞ্জও বটে। সময়মতো উদ্যোগ নেয়া না হলে এর প্রভাব আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।

এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে হাম বর্তমানে উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এটি দ্রুত মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। আগে ৩০টি জেলায় ছিল, এখন তা ৫৬টি জেলায় ছড়িয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও তা পর্যাপ্ত গতিতে ও সমন্বিতভাবে এগোচ্ছে না, বিশেষ করে লোকবলের অভাবে। শুধু স্বাস্থ্য সহকারীদের ওপর নির্ভর না করে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মী ও এনজিওকে যুক্ত করার দরকার ছিল।’

তিনি বলেন, ‘জ্বর দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসা নেয়া উচিত। কারণ পরে র‍্যাশ দেখা দেয়। গ্রামীণ এলাকায় নিকটস্থ প্রাইভেট চিকিৎসকদের সম্পৃক্ত করা গেলে দ্রুত প্রাথমিক সেবা দেয়া সম্ভব। অপুষ্ট ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের ঝুঁকি বেশি; তাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়, দ্রুত টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।’