দেশে সরকার অনুমোদিত প্রথম বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৯২ সালে যাত্রা করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ)। গত তিন দশকে শিক্ষা ও গবেষণায় নিজেদের অবস্থান বেশ সুদৃঢ় করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। যদিও ব্যবস্থাপনাগত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ম্লান হতে বসেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনএসইউর আর্থিকসহ সার্বিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির ২৮ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এ-বিষয়ক একটি চিঠি এনএসইউ ট্রাস্টি বোর্ডকে (বিওটি) পাঠানো হয়েছে। এনএসইউর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এ চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, এনএসইউর প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষিত হিসাব মন্ত্রণালয়ের মনোনীত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনর্নিরীক্ষা করাতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব একেএম আফতাব হোসেন প্রামাণিক বণিক বার্তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার আলোকে এনএসইউর বিষয়ে ইউজিসিকে দিয়ে একটি তদন্ত করানো হয়। সে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মন্ত্রণালয়ের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ ও মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এনএসইউকে বেশকিছু বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এনএসইউ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্য নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টের মাধ্যমে। ট্রাস্ট গঠন-সংক্রান্ত দলিলের শুরুতেই বলা হয়েছে, এ ট্রাস্ট মানবহিতৈষী, দানশীল, জনহিতকর, অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও অবাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হবে। যদিও নর্থ সাউথ ট্রাস্টি সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে নিজেদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন। বিওটিসহ নিজেদের তৈরি করা বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কমিটির সভা ডেকে বড় অংকের সিটিং অ্যালাউন্স নেন ট্রাস্টিরা। সভাভেদে সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ একেকজন সদস্য নিচ্ছেন ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও কেনাকাটা কিংবা সেবার নামে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে এনএসইউর কয়েকজন ট্রাস্টির বিরুদ্ধে।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিওটি সদস্যদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কাজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকাণ্ডকে যেন এমনভাবে পরিচালনা করা না হয়, যেখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে।

কয়েক বছর আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি কমিটি বাতিলের বিষয়ে মতামত জানাতে ইউজিসিকে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটিগুলো হলো প্রোগ্রাম রিভিউ কমিটি, প্রশাসনিক পদোন্নতি কমিটি, শিক্ষক পদোন্নতি কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি, শিক্ষক অনুসন্ধান কমিটি, ডিগ্রি পর্যালোচনা কমিটি, ছাত্র ভর্তি কমিটি, নিড অ্যাসেসমেন্ট কমিটি, টেকনিক্যাল কমিটি, ক্রয় কমিটি, শিক্ষক ছুটি কমিটি, একাডেমিক রিভিউ কমিটি, কনফারেন্স ট্র্যাভেল ও রিসার্চ গ্র্যান্ট কমিটি, আইন ও সাংবিধানিক কমিটি, ছাত্র বৃত্তি কমিটি, ক্যাম্পাস উন্নয়ন কমিটি, অডিট কমিটি, ইন্টারন্যাশনাল প্রমোশন অ্যান্ড অ্যাফিলিয়েশন কমিটি ও অন্যান্য কমিটি। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, দ্বৈততা এবং অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় এনএসইউর ১৫টি কমিটি বাতিলের সুপারিশ করে ইউজিসি। যদিও সুপারিশ প্রতিবেদন পাঠানোর কয়েক বছরেও বাতিল করা হয়নি কমিটিগুলো। এসব কমিটি কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন আইনি বলে গঠিত, সর্বশেষ দেয়া চিঠিতে সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে মন্ত্রণালয়।

এদিকে কোনো ট্রাস্টি সদস্য কোনো ধরনের বেআইনি বা অনৈতিক কাজ করলেও ওই সদস্যকে বিওটিতে না রাখার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, নর্থ সাউথের বিওটির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে বেআইনি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণিত হলে তাকে সদস্যপদে রাখা যাবে না।

যদিও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নথি জালিয়াতি-বিষয়ক একটি মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে নাম এসেছে এনএসইউ ট্রাস্টি মোহাম্মদ শাহজাহানের নাম। এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির কাছ থেকে তথ্যও চেয়েছে।

এছাড়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও অনুন্নত এলাকার মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থী ভর্তি ও তাদের জন্য দেয়া বৃত্তি ও ছাড়; গবেষণা ব্যয়, জঙ্গি তত্পরতা এবং আইন-শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধে গৃহীত কার্যক্রম বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য জানতে চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এনএসইউ’র বিওটি চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিওটির একটি সভায় আমাকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন পর্যন্ত কোনো সভা ডাকা সম্ভব হয়নি। একাডেমিক বিভিন্ন কার্যক্রমে ভার্চুয়ালি অংশ নিচ্ছি। মন্ত্রণালয় থেকে যেসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সেগুলো অনুসরণ করা হবে। যেসব বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে তাও মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নির্দেশনার আলোকেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে চাই।