ধানের জেলা হিসেবে খ্যাতি রয়েছে দিনাজপুরের। অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমেও উৎপাদনের দিক থেকে সে সুনাম অব্যাহত রেখেছেন জেলার কৃষকরা। গত বছর যেখানে বিঘাপ্রতি ৩২-৩৫ মণ ধান পেয়েছেন, এবার সেখানে গড়ে ৪০ মণেরও অধিক ধান মাড়াই করেছেন তারা। চাষীরা বলছেন, আগাম বৃষ্টি না হওয়া, সুষম সার ও উচ্চফলনশীল জাতের ভ্যারাইটি বেশি থাকায় জেলায় ধান উৎপাদন বেড়েছে।

প্রতি মৌসুমেই এ জেলায় ধান উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ছে। অথচ বিগত বছরগুলোতে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে ব্যর্থ হয়েছে খাদ্য বিভাগ। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজার মূল্য বেশি হওয়ায় খাদ্যগুদামে ধান বিক্রিতে অনাগ্রহ কৃষকের। একইভাবে বাজারে চালের মূল্য বেশি থাকায় মিলমালিকরাও লোকসান গুনে সরকারের কাছে চাল বিক্রি করতে অনীহা প্রকাশ করে আসছেন। ফলে এ বছর দিনাজপুরে বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ চাল সরবরাহের জন্য খাদ্য বিভাগের সঙ্গে জেলার ১ হাজার ৮০০ মিলমালিক চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।

জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গত ৭ মে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, যা আগামী ১৬ আগস্ট পর্যন্ত চলমান থাকবে। দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম সাইদুল ইসলাম জানান, দিনাজপুর জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৪০ টাকা কেজি দরে ৯১ হাজার টন সেদ্ধ চাল, ৩৯ টাকা কেজি দরে সাত হাজার টন আতপ চাল এবং ২৭ টাকা কেজি দরে ২৪ হাজার টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

জেলার ২৬টি এলএসডি ও একটি সিএসডি গুদামে গতকাল পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৮৪১ টন সেদ্ধ চাল ও ২ হাজার ৭০৩ টন আতপ চাল ও ১৯ হাজার ৯৩৩ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাকি সময়ের মধ্যে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। কারণ মৌসুম শেষ দিকে হওয়ায় বেশির ভাগ কৃষকের ঘরে এখন ধান নেই।

এদিকে জেলায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দুই সপ্তাহ থেকে বাড়ছে ধানের দাম। গত শনিবার দিনাজপুরের অন্যতম বৃহৎ ধানের হাট সদর উপজেলার পাঁচবাড়ী গিয়ে দেখা যায়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৭৫ কেজি) ধানের দাম বেড়েছে প্রকার ভেদে ২৫০-৫০০ টাকা পর্যন্ত। দুই সপ্তাহ আগে উফশী জাতের ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ (৭৫ কেজি) প্রতি বস্তা ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৫০ টাকা, বিআর-২৮, মিনিকেট জাতের ধান ২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ২৫০ টাকা এবং সম্পা কাঠারী জাতের ধান ২ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা জানান, এখন মৌসুম শেষ দিকে হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকের ঘরে ধান নেই। ধানের মজুদ এখন বড় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছে।

এদিকে কৃষি বিভাগ প্রদত্ত তালিকায় নাম আছে আবার খাদ্য বিভাগের ধান সরবরাহ লটারিতেও নামও উঠেছে, এমন কৃষকও খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করছেন না। কারণ জানতে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। চিরিরবন্দর উপজেলার আব্দুলপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বাজারত ধান নিয়া যাছি ২৬-২৭ টাকা দর পাচ্ছি। সরকার যা দাম দিছে বাজারত সেই দাম। তাইলে ধান শুকায়া নিয়মনীতি পালন করিয়া অত কষ্ট কায় করির যাবে। তাছাড়া এক টন ধান নিবে তাও টাকা পাইতে কত কাহিচাল।’

একই এলাকার এক কৃষক বলেন, কৃষক গুদামে ধান নিয়ে গেলে শুরু হয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা। অথচ ফড়িয়ারা ধান নিয়ে গেলে কোনো ঝামেলা নেই। তিনি বলেন, একেকজন ফড়িয়া বাজার থেকে ১৫-২০ টনের অধিক ধান কিনে গুদামে সরবরাহ করেন।

রাইস মিলমালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরে মিল সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ধানের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা সঙ্গে দামও বাড়ছে। বেশি দামে ধান কিনতে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। দাম বেশি পেয়ে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। এ জেলায় অটোরাইস মিল রয়েছে ২৯৪টি। আর হাস্কিং মিলের সংখ্যা ১ হাজার ৮২৪টি।

দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার মৌসুমের শুরুতে সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। গত বোরো মৌসুমের মত এবারো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যেন ব্যাহত না হয়, সেজন্য খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে নির্দেশনা দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। কৃষক যাতে কোনোভাবে হয়রানির শিকার না হন, নির্দেশনাতে তাও বলা হয়েছে। আমরা আশা রাখি এবার সংগ্রহ অভিযান শতভাগ সফল হবে।