মৌলভীবাজার জেলার সঙ্গে ভারতের সীমান্ত রয়েছে ২৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে বড়লেখা উপজেলার সঙ্গে রয়েছে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ছোট-বড় টিলাসংবলিত সীমান্ত। এখান থেকে স্থলপথে মিয়ানমারের দূরত্ব ৩৬৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের আসাম ও মণিপুর রাজ্য। তিন দেশের নিকটতম সীমান্ত হওয়ায় ভৌগোলিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তটি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে থেকে ৩ জুন এ ২৮ দিনে শুধু মৌলভীবাজারের সীমান্ত দিয়েই বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া (পুশ-ইন) হয়েছে ৩৮০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুশ-ইন করা হয়েছে বড়লেখার পাল্লাথল সীমান্ত দিয়ে। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে দেশের সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে ১ হাজার ২৮৭ জনকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি। পুশ-ইন করা নাগরিকদের মধ্যে মিয়ানমার ও ভারতের নাগরিকও রয়েছেন। এভাবে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে পুশ-ইনের ঘটনা চলতে থাকলে তা সীমান্ত সুরক্ষার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, পুশ-ইনের সংখ্যার দিক থেকে মৌলভীবাজারের পরই খাগড়াছড়ি সীমান্তের অবস্থান। এ সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেয়া হয়েছে ১৩২ জনকে। এছাড়া সিলেট সীমান্ত দিয়ে ১১৫ জন, কুড়িগ্রাম দিয়ে ৯৩ এবং লালমনিরহাট দিয়ে ৮৫ জনকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের গহিন অরণ্য মান্দারবাড়িয়া দিয়ে ৭৮, হবিগঞ্জ দিয়ে জন, সুনামগঞ্জ দিয়ে ১৬, কুমিল্লা দিয়ে ১৩, ফেনী দিয়ে ৫২ জনকে পুশ-ইন করা হয়েছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহ দিয়ে ২২ জন, ঠাকুরগাঁও দিয়ে ৩২, পঞ্চগড় দিয়ে ৫৫, দিনাজপুর দিয়ে ১৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে ২৫, কুষ্টিয়া দিয়ে নয়জন, মেহেরপুর দিয়ে ৩০, চুয়াডাঙ্গা দিয়ে ১৯, ঝিনাইদাহ দিয়ে ২৩ এবং সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ২৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, মৌলভীবাজারের সঙ্গে ভারতের ২৭১ কিলোমিটার সীমানা রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সঙ্গে ৪৯ কিমি। কমলগঞ্জের ৭৩, কুলাউড়ার ৪৩, জুড়ীর ৬৪ ও বড়লেখার সঙ্গে ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্তের প্রায় পুরোটাই টিলাবেষ্টিত। যে কারণে এ সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন করা তুলনামূলক সহজ। এ পাঁচ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুশ-ইন করা হয়েছে বড়লেখা সীমান্ত দিয়ে। মোট ৩৮০ জনের মধ্যে শুধু বড়লেখা উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ২৭৬ জনকে পুশ-ইন করা হয়। এ সীমান্ত এলাকার পুরোটাই ছোট-বড় টিলাবেষ্টিত হওয়ায় সহজেই নজরদারি এড়িয়ে ঠেলে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিজিবির নিউ পাল্লাথল বিওপির টহল বাহিনী বিএসএফের পুশ-ইন করা ১৩ ব্যক্তিকে আটক করে। এদের মধ্যে চারজন পুরুষ, তিন নারী ও ছয় শিশু রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা এরা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের। এর আগে ২৪ মে রাতে ১২১ জনকে বড়লেখার পাল্লাথল সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন করেছিল বিএসএফ। তাদের আটক করে পরিচয় শনাক্তের পর থানায় সোপর্দ করে বিজিবি। পরে থানা পুলিশ স্বজনদের জিম্মায় আটকদের ছেড়ে দেয়। বড়লেখা থানার ওসি আবুল কাশেম সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিজিবি আমাদের কাছে যাদের হস্তান্তর করেছে, আমরা তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের জিম্মায় দিয়েছি।’

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পুশ-ইন কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। যখন একটি রাষ্ট্র তার সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ব্যবহার করে অন্য রাষ্ট্রে কাউকে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়, তখন তা ওই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিসা বন্ধ, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল, আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির পর পুশ-ইন টানাপড়েনের আরেকটি নিদর্শন। এ দূরত্ব থেকে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুশ-ইনের মতো কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী এবং পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এখানে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনেরও পতন হয়। এটা ভারতের শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি। প্রথমে তারা নানা ধরনের প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেগুলো আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় পরবর্তীতে তারা পুশ-ইন শুরু করে। একটা জিনিস লক্ষণীয়—যাদের সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তারা সবাই মুসলিম। কোনো হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীকে কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত ঠেলে দেয়নি। দেখা গেছে যেসব মুসলিম পরিবারের পূর্বপুরুষ ভারতে ছিল তাদের আত্মীয়-স্বজনদের এখন বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এখান থেকে বের হতে হলে সবার আগের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যাম্পেইন। পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়ে নিয়োমিত আলোচনার মধ্য দিয়ে পুশ-ইন রোধ করা দরকার।’

বিজিবির উপমহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইন ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেও এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সীমান্তে পুশ-ইন ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে বিজিবি।’