দেশের একমাত্র কুমারী বন (ভার্জিন ফরেস্ট) বান্দরবানের সাঙ্গু সংরক্ষিত বন। ১৮৮১ সালে ৮২ হাজার ৮০ একর আয়তনের বনকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। বান্দরবান বন বিভাগে মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ১৪৮টি। বন বিভাগের জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৮৮টি পদই শূন্য রয়েছে। জনবল সংকটের মধ্যেই নতুন চারটি বিট অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। বান্দরবান বন বিভাগের থানচি রেঞ্জের আওতাধীন থাকবে ওই বিট অফিসগুলো। এছাড়া তুমব্রু সীমান্তের কাছে ১০৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ, যার ৪৫ কিলোমিটারই পড়েছে সংরক্ষিত বনের মধ্যে। এরই মধ্যে নতুন বিট অফিস স্থাপনের অনুমোদনের সঙ্গে সরকার জনবলও নিয়োগ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগ বান্দরবানের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আব্দুর রহমান।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৩৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৯ প্রজাতির উভচর এবং ১১ প্রজাতির বিরল পাখি ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ বনে বিভিন্ন আকারের গাছ, বিভিন্ন স্তরের ছাউনি এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা আপন গতিতে বেড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময় বনের মূল্যবান কাঠ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। আশির দশক থেকে শুরু হয় এ অভিযোগ, যা এখনো বিদ্যমান। শুরুতে কাঠ পাচার নৌপথে হলেও পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয় সড়ক পথ। তা ঠেকাতে বা বন রক্ষায় বন বিভাগ তৎপর রয়েছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাধারণত প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং বনজ সম্পদ রক্ষার জন্য সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত থাকে। এ কারণে সংরক্ষিত বনে নতুন কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থাপনা নির্মাণ হতে পারে। এর মধ্যে সড়ক নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্য বনভূমি ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব বিবেচনা ও মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত দেয়।

বন বিভাগ বলছে, বর্তমানে থানচি রেঞ্চ ও সাঙ্গু সংরক্ষিত বন রক্ষায় একজন ফরেস্টারসহ তিনটি পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে যেখানে একজন ফরেস্ট রেঞ্জারের নেতৃত্বে ১০টি পদ রয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবান সদর রেঞ্জে ১০ পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি। যাদের বিভিন্ন রেঞ্জ থেকে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় সংযুক্ত রাখা হয়েছে। তবে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী বান্দরবান ডিভিশনে পদ রয়েছে ১৪৮টি। জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ৮৮টি পদ। মূলত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সাঙ্গু সংরক্ষিত বন সংরক্ষণে থানচি রেঞ্জের অধীনে নতুন চারটি অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিট অফিসগুলোর মধ্যে রয়েছে বড় মদক বিট অফিস, লইক্রে পাড়া, ৬৯ পিলার সীমান্ত সড়ক বিট অফিস ও ৬৩ পিলার সীমান্ত সড়ক বিট অফিস।

যুগ যুগ ধরে সাঙ্গু সংরক্ষিত বনের কাঠ পাচারের অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি বাস্তুহারা ও ছত্রভঙ্গ হয়ে তৃণভোজী, নিশাচরসহ একাধিক বিলুপ্তিপ্রায় প্রাণীও হুমকির মধ্যে রয়েছে। প্রাণীগুলোর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রাণীর দেখা মিলছে না, যার মধ্যে গন্ডার, কালো চিতা উল্লেখযোগ্য।

জানতে চাইলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে সিংগাফা মৌজার হেডম্যান মুইশৈথুই মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাঙ্গু সংরক্ষিত বনে এখনো বড় বড় চাঁপাফুল গাছ আছে, যা আট-১০ জন মানুষ ঘিরে ধরেও বেড় মেলাতে পারবে না। চাঁপার মতো বড় প্রজাতির গাছের মধ্যে জারুল, গর্জন, চাপালিশ, গোদা, গুটগুটিয়া, লালি, বৈলামসহ আরো বেশ কয়েক প্রজাতির বনজ ও ফলদ বৃক্ষ রয়েছে। বনে এখনো দেখা মেলে ধনেশ পাখি, বাদুড়, টিয়া, ময়না, বন ছাগল, ভালুক, চিতা বাঘ, সজারু, বন মুরগি, মথুরা, বন বিড়াল, গুইশাপ, অজগর, কিং কোবরা, জংলি বড় কচ্ছপ, ঝিরির পাশের গর্তে থাকা ছোট আকারের রঙিন কচ্ছপ। এছাড়া কখনো কখনো সাঙ্গু সংরক্ষিত বনে বুনো হাতির বিচরণও দেখা যায়।

সম্প্রতি পরিদর্শনকালে বনের গহিনে ভালুকের মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন থানচি রেঞ্জ ও সাঙ্গু সংরক্ষিত বনের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরেস্টার মো. তৌহিদুর রহমান টগর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বনের ভেতরে একটি বৈলাম গাছের বেড় পেয়েছি ১৪ মিটার। এছাড়া ইয়ংবমপাড়ার কাছে ১ হাজার একর জায়গায় এখনো মানুষের পা পড়েনি।’

নতুন চারটি বিট অফিস স্থাপনের বিষয়ে বন বিভাগ বান্দরবানের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সীমান্ত সড়ক নির্মাণ হচ্ছে, এ কারণে বনে যাওয়া-আসা জনসাধারণের জন্য সহজ হয়ে যাবে। বন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সড়কগুলোর অভিমুখে বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারির জন্য অফিসের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। নতুন অফিস হলে সরকার জনবল দেবে। এরই মধ্যে নতুন নতুন ফরেস্ট রেঞ্জার (এফআর) নিয়োগ হচ্ছে। থানচিতে তাদের দায়িত্ব দেয়া হবে। বান্দরবানে এফআর পদে একজন যোগ দিয়েছেন।’