রাঙ্গামাটিতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করে থাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। তবে বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের পানি পরিশোধনে ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্রাহকের কাছ থেকে পানির বকেয়া বিল আদায়ে ব্যর্থ হওয়ায় আর্থিকভাবে ধুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি। পৌর এলাকাজুড়ে প্রায় চার হাজার পানির সংযোগের বিপরীতে মাসে ১৪ লাখ টাকা পানির বিল হয় প্রতিষ্ঠানটির। বার্ষিক হিসাবে পানির বিল আদায় হয়ে থাকে মোট বিলের ৬০ শতাংশ। দিনে দিনে পানির বকেয়া বিল পাওনা থাকায় বাড়ছে বিদ্যুৎ বিভাগের দেনার পরিমাণ। 

ডিপিএইচইর হিসাব বলছে, বর্তমানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর মোট ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা পানির বিল বকেয়া পায়। অন্যদিকে বিপিডিবির দেনা হিসাবের তালিকায় ৪ কোটি টাকা বকেয়ার বিপরীতে শীর্ষ রয়েছে ডিপিএইচই। বারবার বকেয়া আদায়ে তাগিদ ও মাইকিং করেও ব্যর্থ হয়েছে ডিপিএইচই। এবার শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার পাশাপাশি লোকসান ঠেকাতে বকেয়া আদায়ে আইনানুগ ব্যবস্থা ও বর্তমান ব্যয় বৃদ্ধির খরচ অনুপাতে পানির দাম বাড়ানোর কথাও ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি।

রাঙ্গামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি রাঙ্গামাটিতে তিনটি গ্রাহক ক্যাটাগরিতে পৌর এলাকায় পানি সরবরাহ করে। প্রাইভেট ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন দোকান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন সরকারি অফিস ও অফিসের স্টাফ কোয়ার্টার এবং আরেকটি ক্যাটাগরি হলো আবাসিক খাত। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত জেলা জনস্বাস্থ্যের ৪ হাজার ৩৫৮টি বৈধ সংযোগ রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানির বিল বাবদ বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রাইভেট খাতে (দোকান-হোটেল) ৪৬ লাখ টাকা, সরকারি প্রতিষ্ঠান খাতে ৬৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও আবাসিক খাতে ৩ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এদিকে গত মে মাসে গ্রাহকের পানির বকেয়া বিল পরিশোধে তাগিদ দিয়ে শহরজুড়ে মাইকিং করেছিল ডিপিএইচই। মাইকিংয়ে ৩১ মের মধ্যে বকেয়া টাকা পরিশোধে তাগিদ দেয়া হলেও আশানুরূপভাবে বকেয়া অর্থ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রতি মাসের স্বাভাবিক যে পানির বিল পাওয়া যায় সে তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ উত্তোলন বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া।

নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘সাধারণত আবাসিক গ্রাহক মাসিকভাবে পানির বিল পরিশোধ করলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে জুন ও ডিসেম্বরের দিকে বিল পরিশোধ করে। আমাদের মোট সংযোগের হিসাবে আবাসিক ক্যাটাগরিতে পানির বিল বকেয়া থাকলেও সরকারি অফিসগুলোর বকেয়ার পরিমাণই বেশি। দেখা গেছে মাসিক ৮ লাখ টাকা পানির বিল আদায় হলেও আমাদের বিদ্যুৎ বিল আসে প্রতি মাসে ১২ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও শ্রমিকের মজুরির অর্থ ব্যয়সহ আমাদের প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মতো ব্যয় করতে হয়। উত্তোলনকৃত পানির বিল থেকেই এ অর্থ ব্যয় করতে হয়। সে হিসাবে আমাদের প্রতি মাসেই ঘাটতি থেকে যায়। এভাবেই যদি চলতে থাকে এবং পানির বকেয়া বিল যদি আদায় না হয় সেক্ষেত্রে পৌর এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। আমরা এরই  মধ্যে পানির বকেয়া বিল আদায়ে কার্যক্রম শুরু করেছি। শহরে মাইকিং ও বিভিন্ন সরকারি অফিসকে নোটিস দিয়েও তাগিদা দেয়া হয়েছে। এতে কাজ না হলে আমাদের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে।’

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার সংযোগের বিপরীতে ১৪ লাখ ৬ হাজার টাকা বিল তৈরি করা হয়। বার্ষিক ৬০ শতাংশ পানির বিল গ্রাহক থেকে উত্তোলন হলেও বাকি ৪০ শতাংশ বকেয়া থেকে যাচ্ছে। যে কারণে বছর বছর পানির বিল বকেয়ার অংক বাড়ছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে গ্রাহকের পানির বিল পুনর্নির্ধারণ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এরপর আর পানি দাম বাড়ানো হয়নি। তবে বর্তমান সময়ে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় পানির দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে আবাসিক খাতে হাফ ইঞ্চি পাইপের মাসিক পানির দাম ১৪০ টাকা আর থ্রি-ফোর পাইপের পানির দাম ২৬০ টাকা। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ৫০-৬০ শতাংশ পানির দাম বৃদ্ধির কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। সে হিসাবে হাফ ইঞ্চি লাইনের খরচ বেড়ে হবে ২১০-২২৪ টাকা আর থ্রি-ফোর লাইনের খরচ ৩৯০-৪১৬ টাকা হতে পারে।

বকেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগ রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী অনিন্দ্য কৌশল বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের চাহিদাপত্র পাওয়ার পরই আমরা বিষয়টি নিয়ে হেড কোয়ার্টারে চিঠি লিখেছি। আমাদের বিল পরিশোধে আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পেলে বকেয়া বিল পরিশোধ করা হবে।’ একই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সওজ রাঙ্গামাটি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ আল-নূর সালেহীন বলেন, ‘গতবার আমরা পানির বিলের কিছু টাকা পরিশোধ করেছি, সম্ভবত এটা জুন ফাইনালের পর তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি দেখে আমরা সামনে পরিশোধ করে দেব।’ 

অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) রাঙ্গামাটি বিতরণ বিভাগের তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয়ের অধীনে ১১টি গ্রাহক হিসাবের বিপরীতে বকেয়া ছিল ৪ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ টাকা। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে চলতি হিসাবের কিছু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের বকেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিপিডিবি রাঙ্গামাটি বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুর রহমান বলেন, ‘গত অর্থবছরে জনস্বাস্থ্যের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল এসেছে, সে বিলের মধ্যেও ৩০ লাখ টাকা বকেয়া রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৪ কোটি টাকার অধিক বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পাওনা রয়েছে বিপিডিবি।’