মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের বিষয়টি আকস্মিক হলেও একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত দেশটির সাধারণ নির্বাচনের পর থেকেই দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে গত সপ্তাহে তাতমাদোর (বর্মি সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম) শীর্ষ জেনারেলদের প্রচ্ছন্ন নানা হুমকি দেশটিতে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলকে। যদিও এর আগে নির্বাচনের ফলাফল থেকে দেশটির পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিল সবাই। একই সঙ্গে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল মিয়ানমারকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতেও।

অভ্যুত্থানের অনেক আগে থেকেই নেপিদোকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক কূটনীতিতে এক ধরনের নিঃশব্দ লড়াই দেখা যাচ্ছিল। নির্বাচনের আগে নানা প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে নেপিদোয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কূটনীতিকদের ভিড় সেদিকেই ইঙ্গিত করছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী দেশগুলোর শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বরা আকস্মিকভাবেই মিয়ানমারে সফরের মাত্রা বাড়িয়েছেন। এর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অভ্যুত্থান না হলে করোনা ও ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বিন্যাসে যে বদলের হাওয়া দেখা যাচ্ছিল, সেটিতে মিয়ানমারের বড় প্রভাবক হয়ে ওঠার সুযোগ ছিল। এরই সুযোগ নিতে চাইছিল আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে সক্রিয় দেশগুলো।

৮ নভেম্বরের নির্বাচনে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) ভূমিধস বিজয়ের পর এ কূটনৈতিক টানাহেঁচড়া আরো জোরালো হয়ে ওঠে। অং সান সু চির নেতৃত্বে দলটি পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে তাতমাদোর প্রভাব কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, অং সান সু চি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কূটনীতির অন্তরালের লড়াইয়ে নেপিদোকেন্দ্রিক টাগ-অব-ওয়ার আরো জোরালো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল অনেক। এক্ষেত্রে বেইজিংয়ের বৈরী দেশগুলোর সামনে মিয়ানমারে চীনের প্রভাব হ্রাসের অনেক বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল নভেম্বরের নির্বাচন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দাবি, এ কারণেই নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দেশের নেপিদোকেন্দ্রিক কূটনৈতিক তত্পরতা হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে বেসামরিক প্রশাসনের অবিসংবাদিত নেতা অং সান সু চির আনুকূল্য পাওয়ার তত্পরতা যেমন ছিল, তেমনি প্রয়াস ছিল দেশটির ক্ষমতাধর সশস্ত্র বাহিনী প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে খুশি রাখারও।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে যুযুধান দেশগুলোর একের পর এক সামরিক, বেসামরিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বের মিয়ানমার সফরের বিষয়টি সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল চীন, ভারত ও জাপানের মতো দেশগুলো। ওই সময় দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী মিয়ানমারে প্রভাব বাড়ানো নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চালাতে দেখা গিয়েছে। নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তত্পরতা চালাতে দেখা গিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোকেও।

কূটনৈতিক ভাষ্যকাররা বলছেন, মিয়ানমারে চীনের প্রভাব দিন দিন যেভাবে বেড়েছে, তাতে করে বেইজিংয়ের প্রতিপক্ষরা নেপিদোর দিকে অনেক বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশটিকে চীনের প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জোরালো প্রয়াস চালিয়েছে জাপান। অন্যদিকে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান বৈরিতা মিয়ানমারকেন্দ্রিক ‘গ্রেট গেমের’ অংশ করে তুলেছে ভারতকেও। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক কূটনীতিতে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। এর বিপরীতে চীনও বরাবরের মতো নিজের প্রভাব ধরে রাখা এবং তা ক্রমেই বাড়িয়ে তোলার প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছে নিরলসভাবে।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়ার ভিন্নতা থেকে নেপিদোকেন্দ্রিক কূটনৈতিক লড়াই নিয়ে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের এ ধারণা এখন আরো দৃঢ় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে অং সান সু চিসহ আটককৃত রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে হুমকি দিয়েছে নেপিদোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।

কড়া কোনো বক্তব্য না দিলেও মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে চীনের বৈরী দেশ ভারতও। নিজেকে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দৃঢ় সমর্থক দাবি করে নয়াদিল্লি আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য নেপিদোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। নিজেকে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সমর্থক ও এর বিপরীত যেকোনো কিছুর বিরোধী দাবি করে বক্তব্য দিয়েছে জাপানও।

বিপরীতে নির্বিকার প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে চীন বলছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বিষয়টি বেইজিং ‘নোট করেছে’। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিয়ানমারকে ‘বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী’ উল্লেখ করে নেপিদোয় বিবদমান পক্ষগুলোকে সংবিধান ও আইনের মধ্যে থেকেই তাদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে গত মাসে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মিয়ানমার সফরে যান। সে সময় তার সঙ্গে সাক্ষাত্কালে তাতমাদো প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং নভেম্বরের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে বক্তব্য রাখেন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিনের গতকালের প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা জানতে চান, জানুয়ারির ওই সফর চলাকালে মিন অং হ্লাইংয়ের বক্তব্য থেকে ওয়াং ই মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের কোনো ইঙ্গিত পেয়েছিলেন কিনা। এর জবাবে ওয়েনবিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।

গত পাঁচ বছর স্টেট কাউন্সেলর হিসেবে মিয়ানমার সরকারের কার্যত প্রধান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন অং সান সু চি। এ সময় রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর তাতমাদোর নির্মমতার কারণে কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। রোহিঙ্গাদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও তাতমাদোর নির্মমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ব্যর্থতার কারণে এ সময় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয় সু চির। এর বিপরীতে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর প্রতিও কিছুটা নির্ভরশীলতা দেখাতে হয়েছে তাকে।

কিন্তু এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চীনের প্রতি নেপিদোর এ অতিরিক্ত নির্ভরতা সু চিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের দাবি। সরকারি বিভিন্ন মহলেও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা পুনর্বিবেচনার বিষয়ে মতামত তৈরি হচ্ছিল। এক্ষেত্রে ব্যাপক জনসমর্থন ও করোনা-পরবর্তী পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিবেশকে কাজে লাগানোর কথাও ভাবা হচ্ছিল।

নির্বাচনে বিজয়ী দল হিসেবে এনএলডি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দলটির নেতা অং সান সু চির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতো মিয়ানমারের বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে প্রগতির পথে ফিরিয়ে আনা। এছাড়া মিয়ানমারের পূর্ণ গণতন্ত্রে উত্তরণ ও সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনেক দিন ধরেই অনুধাবন করছিলেন তিনি। এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তার বিদেশী সমর্থন ও সহায়তারও প্রয়োজন ছিল অনেক। নিজ পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলো এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সাজাতে হয়েছে তাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাকে অনেকটাই কোণঠাসা করে তুলেছিল রোহিঙ্গা ইস্যু।

অং সান সু চির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে গত ডিসেম্বরে ব্যাংকক পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ক্ষুব্ধ হয়েছেন ঠিকই। তার পরও নেপিদোর রাষ্ট্রীয় মহলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অং সান সু চির সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে পুনরায় সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা ভাবছে। পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণের আগে অং সান সু চি ও তার সহযোগীরা বর্মি পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলোও সেভাবেই সাজাচ্ছিলেন। তাদের এ নীতির মূল বিষয়বস্তু ছিল মিয়ানমারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মিত্রদেশের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে এক দেশের (চীন) ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা।

এক্ষেত্রে চীন যাতে কোনোভাবে ক্ষিপ্ত না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়েছে অং সান সু চিকে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ২০১৫ সালে স্টেট কাউন্সেলরের পদ গ্রহণের পর থেকেই তার অন্যতম বড় ভাবনা ছিল, কীভাবে বেইজিংকে ক্ষুব্ধ না করে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা যায়। বিশেষ করে গত বছর বর্মি নেতাদের কৌশলগত মিত্রের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর বিষয়টি বেশ ভালোমাত্রায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

এ সময়েই মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে জাপানের গুরুত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে নেপিদোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসে নয়াদিল্লিও। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গত নভেম্বরের নির্বাচনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সামনের কয়েক মাসে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেই ভারত, জাপান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিত্রতা আরো দৃঢ় করার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছিল নেপিদো। যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিয়ানমারে চীনের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন এসব দেশের উপস্থিতি বৃদ্ধির বিষয়টি দৃষ্টি এড়ায়নি বেইজিংয়েরও। এ কারণে চীনও গত কয়েক মাসে মিয়ানমারে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়িয়েছে।