গত বছরের ৩০ জুলাই কর্মস্থলের উদ্দেশে যাত্রা করেন চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক এনামুল হক। পথেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। নিহত পুলিশ সদস্যের বড় ভাই মো. ইমরান একই থানার জ্যেষ্ঠ উপ-পরিদর্শক। ইমরান বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দুর্ঘটনায় স্বজনের মৃত্যুর সংবাদ শোনার মর্মান্তিক অনুভূতি শুধু ভুক্তভোগী পরিবারই জানে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সড়কপথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়। এ দুর্ঘটনা রোধে পুলিশ সদস্যদের মোটরসাইকেলযোগে আন্তঃজেলা ভ্রমণ নিষেধ করেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। গত বুধবার ‘অতীব জরুরি’ লেখা এক স্মারকে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) মোহাম্মদ আবদুল্লাহহীল বাকীর স্বাক্ষর করা ওই স্মারকে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই সরকারি বা ব্যক্তিগত কাজে মোটরসাইকেলযোগে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ভ্রমণ করেন। এতে তারা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গুরুতর আহত অথবা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

স্মারকে বলা হয়, এ অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের সরকারি বা ব্যক্তিগত কাজে এমনকি ছুটিতে থাকা অবস্থায়ও এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মোটরসাইকেলযোগে ভ্রমণ না করার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হলো। এ নির্দেশের ব্যতিক্রম মারাত্মক শৃঙ্খলার পরিপন্থী আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

জানা গেছে, রাজধানীর চেয়ে মফস্বলের পুলিশ সদস্যরা মোটরসাইকেলযোগে আন্তঃজেলায় যাতায়াত করেন বেশি। সেক্ষেত্রে মফস্বলের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। ২১ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে উপ-পরিদর্শক এইচএমরনি ওরফে হাদি মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা যান। ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনস্টেবল মুশফিকুর আহমেদ, ১০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কনস্টেবল সুমিত কুমার হূদয় ও ৮ ডিসেম্বর যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় গোপাল দেবনাথ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান। এদের সবার বয়স ২২-৩০ বছর।

রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক সুমনচন্দ্র দাশ বলেন, রাজধানীর সীমানাবর্তী থানাগুলোয় অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরাও ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে আসা-যাওয়া করে ডিউটি করেন। অনেক সময় দেখা যায়, রাত্রিকালীন দায়িত্ব পালন শেষে ঘুম চোখে মোটরসাইকেল চালিয়ে তারা বাড়ি ফেরেন। সম্প্রতি রূপগঞ্জ থানায় এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এ সিদ্ধান্ত সব পুলিশের জন্য কল্যাণকর হবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সাহায্য করবে।

চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার ভাই হারানো পুলিশ সদস্য মো. ইমরান বলেন, বাড়ি কিংবা কর্মস্থলে ফেরার সময় আমাদের মধ্যে এক ধরনের তাড়াহুড়ো কাজ করে। দ্রুত পৌঁছানোর মানসিকতা থেকেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশদের ছুটি কম থাকে, এটাও তাড়াহুড়োর একটা কারণ বলে মনে করি।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি মিডিয়া মো. সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় পুলিশ সদস্যরাও নিহত-আহত হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি দূরত্বে যাতায়াতকারী পুলিশ সদস্যদের বড় অংশ এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। পুলিশ সদস্যদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স আন্তঃজেলা মোটরসাইকেল ভ্রমণ নিষেধ করে উপযুক্ত বিকল্প উপায়ে ভ্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, নিঃসন্দেহে পুলিশ একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল বাহিনী। সড়ক দুর্ঘটনা যখন লাগাম ছাড়া, তখন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এমন সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।

তিনি আরো বলেন, মোটরসাইকেলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাহন নিয়ে মহাসড়কে চলার ব্যাপারে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের সুপারিশ হলো, মহাসড়কে মোটরসাইকেল যাত্রীরা ভালো হেলমেট এবং সুরক্ষাগার্ড পড়েছেন কিনা এটাও যেন পুলিশ নিশ্চিত করে। তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

প্রসঙ্গত, এআরআরআইয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১-২৫ জানুয়ারি সারা দেশে মোট ৮৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৬৭ জন মারা যান ও ২৭ জন গুরুতর আহত হন।