চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত ইটভাটার তিন চতুর্থাংশই অবৈধ। এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে জরিমানার মাধ্যমে নিয়মিত ব্যবস্থা নিত পরিবেশ অধিদপ্তর।  এর মধ্যে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এক সপ্তাহের মধ্যে সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।  আদালতের নির্দেশনা মেনে এরই মধ্যে বেশ কিছু ইটভাটা গুঁড়িয়েও দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।  তবে এখন চট্টগ্রামে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা নিয়ে বিপাকে পড়েছে কর্তৃপক্ষ।  কোনো দফতরেই এ সংক্রান্ত সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

এক দিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানার তাড়া, অন্যদিকে অবৈধ ইটভাটার তথ্য সংগ্রহে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন কর্মকর্তা।

পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যমতে চট্টগ্রাম জেলায় মোট ইট ভাটার সংখ্যা ৪০৮টি।  এর মধ্যে ফিক্সড চিমনি (৮০-১২০ ফুট) ২৮৪টি, জিগজ্যাগ চিমনি ১২১টি এবং অনান্য ইটভাটা আছে ৩টি। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ইটভাটার মধ্যে ৩১০টির পরিবেশগত ছাড়পত্র মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা অনুমোদনপত্রই নেই। 

তথ্যমতে, রাউজানে ৩৬টি, ফটিকছড়িতে ৪৬টি, সাতকানিয়ায় ৩৮টি, হাটহাজারীতে ৪০টি, রাঙ্গুনিয়ায় ৬৯টি, চন্দনাইশে ৩২টি, লোহাগাড়ায় ১৫টি, আনোয়ারায় ৩টি, বাঁশখালীতে ৩টি, সন্দ্বীপে ৪টি, মিরসরাইয়ে ৮টি, সীতাকুণ্ডে ৫টি, বোয়ালখালীতে ৭টি, পটিয়ায় ৩টি ইটভাটা অবৈধ।  তবে বাস্তবে উপজেলাগুলোতে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা আরো অনেক বেশি

গত ১৪ ডিসেম্বর পরিবেশ দূষণ রোধে চট্টগ্রামে অবৈধ ইটভাটা এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।  এসব অবৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি করে ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়। পরিবেশ সচিব, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

হাইকোর্টের নির্দেশনা পেয়েই অবৈধ ইটভাটা বন্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো। গত ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত লোহাগড়া উপজেলায় ৭টি, ফটিকছড়ির ৫টি, হাটহাজারীর ৫টি, রাউজান উপজেলার ৭টি ইটভাটাসহ প্রায় ৩০টি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর।  এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে ইটভাটার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এখন তালিকা অনুযায়ী যেকটি ইটভাটা আছে তার চার ভাগের তিনভাগই অবৈধ। অনেক এলাকার প্রভাবশালীদের কারণে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনেক উপজেলায় কতো ইটভাটা আছে সেগুলোর বিষয়ে তথ্য চেয়ে স্থানীয় জন প্রতিনিধি কিংবা প্রশাসন সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।  তাছাড়া চট্টগ্রাম জেলার মতো একটি বড় জেলায় রয়েছেন মাত্র চার জন কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের (জেলা) উপ-পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ যে হালনাগাদ তথ্য ছিল তাতে চার ভাগের তিনভাগই অবৈধ। হাইকোর্টের নির্দেশনার পরে অনুমোদনহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। অবৈধ ইটভাটা সরিয়ে নিতে ভাটার মালিকদের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম জেলায় আসলে কতো ইটভাটা আছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।

তিনি আরো বলেন, মূলত লোকবল সংকটের কারণে আমরা কাজ করতে পারছি না। তাছাড়া অনেক এলাকার ইটভাটার তথ্য সংগ্রহে আমরা নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছি। অবৈধ ইটভাটার তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরেকে দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

এদিকে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সভায় জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি এবং বসতি নির্মাণের কারণে কৃষিজমির উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় কমিশনার চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিটি জেলা পর্যায়ের কৃষি দপ্তরকে এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা দেন।  যে নির্দশনায় ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ জানানো হয়েছিল।  সে সিদ্ধান্ত আজো বাস্তবায়ন হয়নি। 

চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনজুরুল হুদা বণিক বার্তাকে বলেন, ইটভাটা স্থাপনে সরকারিভাবে নানা নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে নাা। কৃষিজমি কিংবা বসতবাড়িড় পাশেই ইটভাটাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এই ইটভাটার কারণে কৃষির জমির উপরের অংশ বিক্রি, জমির উর্বরতা নষ্ট, বনের কাঠ ব্যবহার এরকম নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশের বড় বিপর্যয় নেমে আসবে।  ইটভাটার অনুমোদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি কৃষি অধিদপ্তরের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখা উচিত বলে মনে করেন এ কৃষি কর্মকর্তা।