অমর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১২টা ১০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় নেপথ্যে বাজছিল কালজয়ী গান—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি... আমি কি ভুলিতে পারি।’
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর এবারই প্রথম একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানালেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনারে দোয়া করা হয়। ভাষাশহীদসহ মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদ, চব্বিশের আন্দোলনের শহীদ, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত এবং দেশের শান্তি-অগ্রগতি-সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। কালো পাঞ্জাবি পরিহিত তারেক রহমান শহীদ বেদিতে দাঁড়িয়ে দোয়ায় অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এরপর মন্ত্রিসভার সদস্যরা শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকেও ফুল দেয়া হয় শহীদ মিনারে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহসহ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন এ সময়।
মন্ত্রিসভা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তারেক রহমান তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাত ১২টা ২১ মিনিটে শহীদ মিনার ত্যাগ করেন সরকারপ্রধান।
সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌ বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান পরে তাদের বাহিনীর পক্ষে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এরপর জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা জানানোর পর তারা বেদিতে দাঁড়িয়ে সম্মিলিত মোনাজাতও করেন।
১১ দলীয় জোটের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশে দায়িত্বরত বিদেশী রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা শহীদ মিনারে ফুল দেন। শ্রদ্ধা জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ অন্য কমিশনাররাও। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পৃথকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সিন্ডিকেট ও সিনেটের সদস্যদের নিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপর সর্বসাধারণের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী একে একে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির গৌরবময় স্মৃতি, সেই সঙ্গে বেদনা আর শোকের রক্তঝরা দিন অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রথমেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির প্রাণের মাতৃভাষা বাংলা উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু এ দেশের বীর সন্তানরা তাজা রক্ত দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর এ অপচেষ্টাকে রুখে দেন।
১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ঢাকায় শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করেন ভাষার জন্য লড়াইরত এ দেশের ছাত্র-জনতা। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেয়া পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, সফিউর, জব্বারসহ নাম না–জানা অনেক বীর সন্তানের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। এরপর ১৯৫৬ সালে এ দেশের মানুষের প্রাণের ভাষা, মায়ের ভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়। এজন্য জাতি প্রতি বছর কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে সেসব ভাষাশহীদকে।
মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। শ্রদ্ধার ফুলে ভরে উঠছে দেশের শহীদ মিনারগুলো। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এজন্য এখন বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বেই অমর এ দিন পালিত হয়। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়াও আজ বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘ভাষা একটি জাতির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক। অনেক ত্যাগ ও শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা ও মান সংরক্ষণে তাই আমাদের আরো যত্নবান হতে হবে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যেতে বাংলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন ভাষার ওপর প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। একটি সমৃদ্ধ জাতি ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন ইতিবাচক অবদান রাখবে—এ প্রত্যাশা করি। একুশের চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত হোক, দেশ ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত হোক।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, ‘বাংলা ভাষা আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহন। মাতৃভাষার জন্য আমাদের ত্যাগ ও ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। একুশের চেতনা আজ বিশ্বজুড়ে সব ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও সুরক্ষার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ভাষাশহীদ এবং ’৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন ও ২০২৪-এর স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এ যাবৎকালে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ, মানবিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চাই।’









