‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ’—এ প্রবাদের সার্থকতা মিলছে দিনাজপুর জেলার লিচুবাগানগুলোয়। চলতি বছর মাঘ মাসের শেষ দিকে বৃষ্টি হওয়ায় দিনাজপুর জেলার লিচুগাছগুলোয় নির্ধারিত সময়ের পরও প্রচুর মুকুল এসেছে। এরই মধ্যে লিচুবাগানগুলোয় তামাটে পাতার ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে লিচুর সোনালি রঙের ফুল।
দিনাজপুর জেলা সদর ছাড়াও বিরল, চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, খানসামা ও কাহারোল উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লিচু উৎপাদন হয়। এ অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ লিচু চাষের উপযোগী। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় এ জেলার মানুষের কাছে দিন দিন সমাদৃত হচ্ছে লিচুবাগান।
দিনাজপুর জেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে আউলিয়াপুর ইউনিয়নের মাশিমপুর গ্রাম। এ মাশিমপুর গ্রামের বেদানা লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। এ লিচুর খোসা পাতলা, শাঁস পুরু ও রসাল এবং বিচি ছোট হয়। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এ লিচু মৌসুমের মধ্যভাগে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে যায়। মাশিমপুর গ্রামের লিচুবাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে লিচুর সোনালি মুকুল। ফাল্গুনের শেষে বাগানগুলোয় লিচুর মুকুল থেকে কুঁড়ি আসা শুরু হবে। আর চৈত্রের শুরুতে কুঁড়ি থেকে ফুটবে গুটি লিচু। সবুজ গুটি থেকে বৈশাখের শেষে শোভা পাবে লাল টকটকে রঙের থোকা থোকা লিচু।
কৃষি বিভগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে দিনাজপুর জেলায় ৫ হাজার ৪৮১ হেক্টর জমিতে লিচু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বোম্বাই লিচু ৩ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে, মাদ্রাজি লিচু ১ হাজার ১৬৬ হেক্টর, চায়না-৩(থ্রি) লিচু ৭০২ দশমিক ৫ হেক্টর, বেদানা লিচু ২৯৪ দশমিক ৫ হেক্টর, কাঁঠালি লিচু ২১ হেক্টর এবং মোজাফ্ফরপুরী লিচু ১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
সরেজমিন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মুকুলে ছেয়ে গেছে প্রতিটি লিচুবাগান। আর বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন লিচু চাষীরা। মুকুল এসে যেন ঝরে না পড়ে, এজন্য এখন থেকেই প্রতিটি গাছের গোড়ায় সেচের ব্যবস্থা করছেন কৃষক।
লিচু চাষী মতিউর রহমান মতি জানান, এ বছর তার বাগানের ১৫ একর জমিতে প্রায় ৬০০ লিচু গাছে মুকুল এসেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার লিচুর ফলন ভালো হবে। গাছপ্রতি ৩ হাজার ৫০০-৪০০০ হাজার লিচুর ফলন হলেও প্রায় ৪২ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করবেন তিনি।
লিচু চাষীরা বলছেন, বিগত বছরগুলোয় লিচু পাকার মৌসুমে রমজান মাস ও পরবর্তী সময়ে করোনা মহামারীর প্রকোপ থাকায় বাগানমালিকরা তেমন লাভবান হতে পারেননি। দিনাজপুর সদর উপজেলার মাশিমপুর এলাকার সৌখিন বাগানমালিক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাশিমপুরের বেদানা লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে চায়না থ্রি লিচুর চাহিদা কিছুটা বাড়লেও স্বাদের দিক থেকে বেদানা লিচু অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতি বছর আমার বাগান থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও সিলেট থেকে বেপারিরা এসে লিচু নিয়ে যান। করোনার দুই বছর বেপারিরা কম এলেও এ বছর বেচাকেনা ভালো হবে বলে আশা করছি।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. খালিদুর রহমান জানান, সারা দেশে লিচুর আবাদ হলেও দিনাজপুর জেলার লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ৪৮১ হেক্টর জমিতে লিচুর উৎপাদন হবে। প্রতি হেক্টরে ২৫০টি লিচু গাছের হিসেবে দিনাজপুর জেলায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার ২৫০টি লিচু গাছে ফলন হবে। এছাড়াও বিছিন্নভাবে বসতবাড়ির প্রায় ৬ লাখ লিচু গাছে ফলন আসবে।
তিনি আরো জানান, লিচু দিনাজপুর জেলার একটি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হয়। দিন দিন এর পরিধি বাড়ছে। এ ফসলের সঙ্গে বাঁশের ঝুড়ি তৈরির পরিমাণ, বাগান শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও পরিবহন ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। লিচু একটি পচনশীল পণ্য। আগে অনেক সময় পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা না থাকার কারণে লোকসানে চাষীদের লিচু বিক্রি করতে হতো। বর্তমানে অনেক পরিবহন সংস্থা লিচুর মৌসুমে সারা দেশে লিচু সরবরাহ করে। অনেক পরিবহন সংস্থা লিচুর মৌসুমে গাড়ির সংখ্যাও বাড়িয়ে দেয়।










