ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) তিনটি বিভাগে নিয়মিত চেয়ারম্যান না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনকে। এর মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এবং কলা অনুষদের ডিন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং সংস্কৃত বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এমন পরিস্থিতিতে ডিনদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজের চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে বিভাগগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে জটিলতা ও বিলম্ব তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন উপাচার্যের পরিবর্তন হলেও বিভাগীয় চেয়ারম্যান সংকটের স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত চেয়ারম্যান ছাড়াই চলছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। ২০২৪ সালের জুনে সর্বশেষ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমেদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে বিভাগটিতে স্থায়ী চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে পদাধিকারবলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনকে বিভাগের চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বিভাগসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমেদের পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ছিল। তবে তার বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত চলমান থাকায় তিনি এখনো দায়িত্ব নিতে পারেননি। ফলে নিয়মিত চেয়ারম্যান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনকেই বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বিভাগীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের পাঁচজন ডিন পদাধিকারবলে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির, অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. মেহেদী হাসান খান এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘দুই বছর ধরে বিভাগে নিয়মিত চেয়ারম্যান না থাকায় শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
কলা অনুষদের অধীন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগেও নিয়মিত চেয়ারম্যান নেই। বিভাগটির সর্বশেষ দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান বিশ্বাস গত ৬ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করায় এ পদটি শূন্য হয়। এরপর ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানীকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে তাকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেন একদল শিক্ষার্থী।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভাগের চেয়ারম্যান পদটি আবারো শূন্য হয়। এরপর ফারসি বিভাগের অধ্যাপক এবং বর্তমান কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকারকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়।
সংস্কৃত বিভাগেও একই চিত্র। বিভাগটির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ময়না তালুকদারের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং তার বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে ড. সঞ্চিতা গুহকে পরবর্তী চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি ড. সঞ্চিতা গুহর নিয়োগ স্থগিত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরপর থেকে বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কলা অনুষদের ডিনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়।
সংস্কৃত বিভাগের মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘চেয়ারম্যান না থাকার প্রভাব শুধু প্রশাসনিক কাজেই সীমাবদ্ধ নয়, একাডেমিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে।’
একই সঙ্গে দুটি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে জানিয়ে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, ‘ডিনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বর্তমানে দুটি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। ফলে একাডেমিক কার্যক্রম, সিএনডি মিটিংসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।’
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম জানান, দায়িত্ব নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিন ও বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তারাও বিভাগ থেকেই চেয়ারম্যান নিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন।
উপাচার্য বলেন, ‘এখন ডিন দায়িত্বে আছেন। আমরা শিগগিরই বিভাগ থেকে চেয়ারম্যান দেয়ার চেষ্টা করব। যিনি পরবর্তী সময়ে দায়িত্বে আসবেন, আমরা তার সঙ্গে বসছি। আশা করি খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।’










