পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হওয়ার সুযোগ দিতে প্রতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা আহরণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকে। একই উদ্দেশে অভয়াশ্রমে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস সব ধরনের মাছ আহরণও নিষিদ্ধ। তবে দুটি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বরিশালে চলছে জাটকা নিধন। নদ-নদী থেকে জাটকা আহরণের পর রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে প্রকাশ্যেই। যদিও জাটকা ধরা বন্ধে মাঠে রয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড। তার পরও জাটকা নিধন, পরিবহন ও বিপণন চলছে।

মংস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে বরিশাল বিভাগের ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৮৯ জেলেকে দেয়া হয়েছে খাদ্যসহায়তা। এরই মধ্যে বিভাগের ৪১টি উপজেলায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩১ টনের বেশি চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬২ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাটকার বিচরণের প্রধান ক্ষেত্র চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা এবং শরীয়তপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা ও সংযুক্ত শাখা নদী তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর ইত্যাদি। এছাড়া দক্ষিণে সাগর মোহনাসংলগ্ন আগুনমুখা, আন্ধারমানিক ও বলেশ্বর নদীতেও জাটকার বিচরণ রয়েছে। মা-ইলিশ প্রজননের জন্য মিঠা পানির সন্ধানে দক্ষিণের পাঁচটি মোহনা দিয়ে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে প্রবেশ করে। ডিম ছাড়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ১ সেন্টিমিটার আকারে ইলিশের জন্ম হয়। সেগুলো তিন মাস পর্যন্ত মা-ইলিশের সঙ্গে নদীতেই থাকে। এ সময়ের মধ্যে আকৃতি ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। ৮০ শতাংশ ইলিশ ডিম দেয় আশ্বিন মাসে। ইলিশের বেড়ে ওঠা নিরাপদ করতে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দেয় মৎস্য অধিদপ্তর। এ কারণে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বরিশাল, চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের নদ-নদীতে জাল ফেললেই জাটকা ধরা পড়ে।

স্থানীয় মোকামগুলোয় প্রতিদিন কয়েক হাজার মণ জাটকা বিক্রি হয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সড়ক ও নৌপথে সারা দেশে জাটকা সরবরাহ করেন। এমনকি যেসব মোকামে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তরা সশরীরে দায়িত্ব পালন করেন, সেখানেও প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। এ ধরনের মোকামের একটি বরিশাল নগরের পোর্ট রোড। বৃহত্তর বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ এ মোকামে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জাটকা বিক্রি হয়। মোকাম থেকে স্বল্প দূরত্বে রয়েছে কোস্টগার্ডের জোন অফিস।

মোকামটির দেখভালের দায়িত্বরত মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাসকে সম্প্রতি বরিশাল থেকে বদলি করা হয়েছে। এখন অন্য একজন মৎস্য কর্মকর্তা এর দেখভাল করছেন।

স্থানীয় জেলেরা জানান, মেঘনার ২২ কিলোমিটার বয়ে গেছে বরিশালের হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট, মাদারীপুরের কালকিনি, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার কোলঘেঁষে। দ্বীপজেলা ভোলার চারপাশে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী। এ এলাকাগুলোর নদীতীরে গড়ে উঠেছে শত শত মাছঘাট। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রভাবশালীরা এসব ঘাটের মালিক। দাদন নেয়া জেলেরা জাটকা ধরে সংশ্লিষ্ট মালিকের মাছঘাটে বিক্রি করেন। বিক্রীত টাকার ১০ ভাগ কমিশন পান মালিক।

এদিকে মেঘনা থেকে ধরা জাটকা বিক্রির বড় মোকাম মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মিয়ারহাট। এছাড়া শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার রেহানউদ্দিনের মাছঘাট, পট্টিবাজার, বরিশাল ও শরীয়তপুরের সীমানায় খোকা ব্যাপারীর মাছঘাটসহ ছোট-বড় আরো অনেক মোকাম রয়েছে। মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ অন্যান্য শাখা নদী থেকে আহরিত জাটকা ট্রলারে এসব মোকামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সড়ক ও নৌপথে সারা দেশে বাজারজাত হচ্ছে।

অন্যদিকে পটুয়াখালীর তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা নদী থেকে ধরা জাটকা বিক্রি হয় গলাচিপার পানপট্টি লঞ্চঘাটসহ কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ছাড়াও চরদোয়ানী মৎস্য উপকেন্দ্র, পদ্মা স্লুইস ঘাট, বাদুরতলা, রুইতা, তালতলী উপজেলার কয়েকটি পয়েন্ট এবং কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর-মহীপুরে জাটকা বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আনিসুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার ইলিশের উৎপাদন বেশি। তাই জাটকা নিধনও বেশি হচ্ছে।’ তবে জাটকা ধরা বন্ধে মৎস্য অধিদপ্তরের অন্য কর্মকর্তাদের মতোই জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা দেখান তিনি। জাটকা জব্দের পর মূল মালিক খোঁজার চেষ্টা তারা করেন না। শুধু পরিবহনকারী শ্রমিকদেরই জেল-জরিমানা করা হয় বলে জানান তিনি।