দেশে দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলো একটি বরগুনা। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা। বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এ অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বন। বরগুনার তালতলী উপজেলার আন্ধারমানিক নদীর কূল ঘেঁষে ২০ কিলোমিটারজুড়ে ছইলা ও কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করেছে বন বিভাগ। যেটাকে বলা হয় সবুজ দেয়াল। তবে নির্বিচারে বন উজাড় করে খনন করা হচ্ছে মাছের ঘের। এতে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ও বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই সংরক্ষিত বনের গাছ কাটা হচ্ছে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গাছ কেটে জমি দখল এবং পরে মাছের ঘের খনন করা হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তালতলী উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া খেয়াঘাট থেকে শারিকখালী ইউনিয়নের চাউলাপাড়া গ্রাম পর্যন্ত আন্ধারমানিক নদীর কূল ঘেঁষে প্রায় ২০ কিলোমিটার বনাঞ্চল রয়েছে। ছইলা ও কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করেছে বন বিভাগ। শ্বাসমূলীয় এসব গাছ বড় হয়ে ঘন জঙ্গল সৃষ্টি করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলীয় মানুষের জন্য সবুজ দেয়াল তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদীর তীরবর্তী বনের ছইলা, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। এখন সেখানে খননযন্ত্র দিয়ে প্রায় ২ একর জমিতে মাছের ঘের করেছেন বাবুল মৃধা ও জাকির মৃধা। তবে তাদের এসব কার্যক্রম বন্ধে বন বিভাগের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। কারণ বন বিভাগের লোকজনের যোগসাজশেই কাজগুলো চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তবে অভিযোগ বিষয়ে বাবুল মৃধা ও জাকির মৃধা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা আমাদের বাড়ির সম্মুখভাগ। এ জমি আমরা বন্দোবস্ত নিয়েছি। এখানে চিংড়ি চাষ করার জন্য ঘের খনন করছি। বন বিভাগের লোকজন আসছিলেন। তারা বিষয়টি দেখে গেছেন।’
এ প্রসঙ্গে বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দখলদারদের নোটিস করা হয়েছে। দখল করা বনের জমি উদ্ধার ও বন উজাড়কারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ১৭.৪ ভাগ, জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় যা সত্যিই অপ্রতুল। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বনায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন বিভিন্ন অজুহাতে ধ্বংস করা হচ্ছে আমাদের দেশের বনাঞ্চল। প্রতি বছর যে হারে বনভূমি কমছে, তাতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। যদি নির্বিচারে গাছ নিধন চলে, তাহলে তা অদূর ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের মারাত্মক প্রভাব পড়বে। বন না থাকলে পশুপাখি কীটপতঙ্গ নিঃশেষ হয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
বন বিভাগের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এ অবস্থায় ২০২০ সালের মধ্যে দেশের মোট ভূখণ্ডের ১৭ শতাংশকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল করার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার; কিন্তু এখনো সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়নি। যেটুকু সংরক্ষিত বন আছে, তাও উজাড় হওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) তালতলী উপজেলার সমন্বয়ক আরিফ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এভাবেই প্রতিনিয়ত উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ধ্বংস ও দখল করছে এক শ্রেণীর মানুষ। তাদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করা উচিত। তাছাড়া উপকূলীয় বনভূমি রক্ষায় প্রশাসনের সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।’
বন আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত কিংবা সরকারি জমিতে কোনো গাছ কাটার আগে স্থানীয় বন বিভাগের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৪ সালের আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ব্যতীত গাছ কাটাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শুধু জরুরি অবস্থা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য গাছ কাটার অনুমতি দেয়া হয়। নতুন আইনে অবৈধভাবে গাছ কাটার জন্য জরিমানা ও শাস্তিও বাড়ানো হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










