খরাপীড়িত রাজশাহী অঞ্চলে একসময় কৃষি ব্যবস্থা ছিল সুসংহত, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বদলে যায় বরেন্দ্রখ্যাত এ অঞ্চলের কৃষি। ভূ-গর্ভস্থ সেচের কল্যাণে বৃষ্টিনির্ভর কৃষিতে বিপ্লব এসেছে। রোপা আমন ছাড়াও উচ্চফলনশীল (উফশী) বোরো ধানের ভাণ্ডার হয়ে ওঠে রাজশাহী। আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, প্রায় এক যুগে এ অঞ্চলে ধান চাষের জমি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৮২ হেক্টর। তবে উল্টো চিত্র উৎপাদনে। এক যুগের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে ৩৪ হাজার ৮৫ টন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অঞ্চলে আমসহ বাণিজ্যিক ফলবাগান বাড়ায় ধান চাষের জমি কমছে প্রতি বছরই। তবে উফশী ও উন্নত জাত আসায় ধান উৎপাদন বেড়েছে। বিজ্ঞানী ও কৃষি দপ্তরের চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কৃষক। ফলে বদলে যাওয়া কৃষিতে তারাই এখন আশার আলো।
রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে রাজশাহী কৃষি অঞ্চল। আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০৮-০৯ মৌসুমে এ চার জেলায় আউশ, আমন ও বোরো মিলিয়ে মোট ধান আবাদ হয় ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমি। তখন ধান উৎপাদন হয় ৩২ লাখ ৭০ হাজার ২৪৩ টন। অন্যদিকে ২০২১-২২ মৌসুমে চার জেলায় মোট ৯ লাখ ৪০ হাজার ৫৩১ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। ধান উৎপাদন হয়েছে ৩৩ লাখ ৪ হাজার ৩২৮ টন। ১৪ বছরের ব্যবধানে ধান চাষের জমি কমেছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৮২ হেক্টর। তবে এ সময়ে উৎপাদন বেড়েছে ৩৪ হাজার ৮৫ টন।
সূত্র আরো জানায়, ২০০৮-০৯ মৌসুমে ধানের জেলাখ্যাত নওগাঁয় ৪ লাখ ৮০ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। ২০২১-২২ মৌসুমে আবাদ এসে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬০ হেক্টরে। ১৪ বছরে এ জেলায় ধান চাষের জমি কমেছে ৩৪ হাজার ৯০ হেক্টর।
অন্যদিকে ২০২১-২২ মৌসুমে রাজশাহীতে ১ লাখ ৯০ হাজার ৯৬১ হেক্টর, নাটোরে ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৯৭ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭১৩ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। ২০০৮-০৯ মৌসুমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টরে, নাটোরে ১ লাখ ৮১ হাজার ১৯০ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭৩ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছিল। ওই বছর রাজশাহীতে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৭২২ টন, নাটোরে ৫ লাখ ৬২ হাজার ১২১ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৫১৮ টন ধান গোলায় তোলেন কৃষক। আর ২০২১-২২ মৌসুমে রাজশাহীতে ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৫, নাটোরে ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৯ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৪৪ টন ধান উৎপাদন হয়েছে।
ধান চাষের পরিধি কমার কথা স্বীকার করেছেন নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন। তিনি জানান, এখানকার কিছু এলাকায় কেবল একটি ফসল-ধান চাষ হতো। সেটিও ছিল বৃষ্টিনির্ভর। সেচসুবিধাসহ আধুনিক প্রযুক্তির কারণে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আসছে। সুবিধাজনক হওয়ায় বরেন্দ্রখ্যাত নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা এলাকায় আমবাগান সম্প্রসারণ হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে আমচাষীরা লাভবান হচ্ছেন। একটি ফসল বাড়লে আরেকটি কমবে—এটিই সাধারণত হয়ে থাকে। ধানের জমিতে আম বাগান হওয়ায় ধান চাষের পরিধি কমছে। তবে আমরা বলছি, যেসব জমি প্রকৃত ধানি, সেগুলো ধানের জন্যই রাখতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, রাজশাহী অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী ধানের বেশকিছু জাত উদ্ভাবন করেছে ধান গবেষণা কেন্দ্রের আঞ্চলিক দপ্তর। খরাসহিষ্ণু জাত ব্রি ধান-৭১ ও পুষ্টি গুণাগুণসম্পন্ন জিংকসমৃদ্ধ জাত ব্রি ধান-৭৪ এবং ব্রি ধান-৮৪ উদ্ভাবন করেছেন এখানকার বিজ্ঞানীরা। বোরো মৌসুমে অধিক ফলনশীল ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৮১, ব্রি ধান-৮৮ এবং ব্রি ধান-৮৯ উদ্ভাবনেও এখানকার বিজ্ঞানীরা বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ব্রি রাজশাহী আঞ্চলের প্রধান ড. ফজলুল ইসলাম বলেন, ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে এখানকার বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন।
এরই মধ্যে বেশকিছু ধানের উন্নত জাত উদ্ভাবন হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান-৭ এবং ব্রি ধান-৯৮ রাজশাহীর গোদাগাড়ী এবং নওগাঁর মহাদেবপুরে চাষ হয়। এ ধান তোলে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে টমেটো এবং মোহনপুরে আলু চাষ করেন কৃষক। সম্প্রতি ব্রি ধান-১০২ উদ্ভাবন হয়েছে। উচ্চমাত্রার জিংকসমৃদ্ধ এবং রোগ প্রতিরোধী এ জাত আগামী বোরো মৌসুমে কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হবে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিজয়নগর এলাকার কৃষক সাব্বির হোসেন বলেন, উন্নত যেসব কৃষিপ্রযুক্তি ও জাত এসেছে, সেগুলো তিনি মাঠে প্রয়োগ করেছেন। ভালো ফলনও পেয়েছেন। তার দেখাদেখি এলাকার অন্য কৃষক এগিয়ে এসেছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, কৃষকের জন্য চাষের নানা কলাকৌশল এনেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন হয়েছে। সেগুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। কৃষক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কৃষিতে বেড়েছে যন্ত্রের ব্যবহার। সুষম সারের প্রয়োগে বেড়েছে ধানের ফলন। এর সুফলও পাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষক।










