২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ছিল ২ হাজার ৭৩৮ ডলার।

গতকাল বিবিএস জিডিপি প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেই মাথাপিছু আয় বাড়ার এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং উচ্চ বেকারত্বের মধ্যেও মাথাপিছু আয় বাড়ার এ তথ্য কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে জিডিপির অন্যতম খাত কৃষি ও সেবা। এ দুই খাতে প্রবৃদ্ধি কমলেও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়া চিত্রও উঠে এসেছে বিবিএসের প্রতিবেদনে।

জিডিপির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ৭৬৯ ডলার। বাংলাদেশে ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ১২০ টাকা ৮২ পয়সা ধরে হিসাব করে বিবিএস বলছে, বাংলাদেশী টাকায় মাথাপিছু এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা। যদিও ডলারের বিদ্যমান হার বিবেচনায় নিলে এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ টাকার কাছাকাছি।

কভিড-১৯ চলাকালে ২০২১-২১ অর্থবছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলার। এর পরবর্তী দুই অর্থবছরে (২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪) এ হার কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২ হাজার ৭৪৯ ও ২ হাজার ৭৩৮ ডলারে।

২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। যার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সার্বিক প্রভাবও পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ওই অর্থবছরের শেষের দিকে মূল্যস্ফীতি ৮-এর ঘরে নামানো গেলেও জুলাই-আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ শতাংশে।

দেশে মাথাপিছু আয় বাড়ার তথ্যে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেলেও দরিদ্রতার সূচকও কয়েক বছর ধরে ঊর্ধ্বমুখিতায় রয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশে বেকারত্বের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ, যা ২০২৩ সালে ছিল সাড়ে ২৫ লাখ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছার পূর্বাভাস দিয়েছিল।

২০২৪-২৫ অর্থবছরজুড়ে কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির মধ্যে মানুষের মাথাপিছু আয় কীভাবে বাড়ল সেই প্রশ্ন রেখেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ছিল অস্থিতিশীল ও স্থবির। এ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুযোগও কম ছিল। এ সময়ে মানুষের কর্মসংস্থান ছিল না, বিনিয়োগ ওই অর্থে দেখা যায়নি, গুণগত কোনো পরিবর্তন হয়নি, সেই সঙ্গে উচ্চ আয়ও বাড়েনি, তাহলে মানুষের মাথাপিছু আয় কীভাবে বাড়ল, সেটা আমার বোধগম্য নয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতেই পারে। কিন্তু মাথাপিছু আয় কীভাবে বাড়বে? এখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিও হিসাব করতে হবে। জনসংখ্যা কোন সেন্সাসে দেখা হয়েছে সেটা দেখতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইং-এর পরিচালক মুহাম্মদ আতিকুল কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘জনসংখ্যার সর্বশেষ এস্টিমেট থেকে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে।’

এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। সেখানে জিডিপি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।

বিবিএসের প্রতিবেদনে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমার চিত্রও উঠে এসেছে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং সেবা খাতে এ প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৪২ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, অন্য প্রবৃদ্ধি কমার তথ্যে মাথাপিছু আয় সামান্য যে বেড়েছে, সেখানে বড় জনসংখ্যার কাছে পৌঁছানো গেছে বলে মনে হয় না। জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ কমছে বলছে। এখানে বিনিয়োগ নেতিবাচক হয়ে গেছে। বিনিয়োগ ধীরগতি হলেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি খুবই কম ও দুর্বল। এটা কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই হতে পারে।