সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ বিল বাবদ বিতরণ কোম্পানিগুলোর পাওনা বকেয়া রয়েছে পৌনে ২ হাজার কোটি টাকা। এ নিয়ে বারবার চিঠি দেয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো তা পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ তুলেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া হয়ে পড়ায় বিতরণ কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নিজ অর্থায়নে বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও সেবার মান বাড়ানো কোম্পানিগুলোর জন্য কিছুটা হলেও দুরূহ হয়ে পড়েছে।
দেশে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত কোম্পানি ছয়টি। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, সরকারি ৫৪ প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানিগুলোর পাওনা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে ১ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এ পাওনা পরিশোধের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নানা সময়ে তাগাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো তা পরিশোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল নিয়ে আশঙ্কা বেশি। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাওনা বেসরকারি পর্যায়ে বকেয়া থাকা মোট বিলের দুই-তৃতীয়াংশ। আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে অনীহা রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিতরণ কোম্পানিগুলোর মোট পাওনা ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে পাওনা ৫ হাজার কোটি টাকা। টাকার অংকে বেসরকারি খাতের কাছে পাওনা বেশি হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিলগুলো বকেয়া রয়েছে তুলনামূলক বেশি সময় ধরে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাওনা বিল আটকে রয়েছে তিন-চার বছর ধরে। বিদ্যুৎ বিভাগ এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার চিঠি দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো বিল পরিশোধ করছে না।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ নিয়ে আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বহুবার বলেছি। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাইনি। তবে কিছুটা হলেও তাদের কাছ থেকে বকেয়া বিল পাচ্ছি। সরকারি বকেয়া বিল আদায়ে আমাদের খুব বেশি সমস্যা হবে না। বিশেষ করে মিউনিসিপ্যালিটি বিলগুলো আমরা দ্রুত পেয়ে যাব। কভিডের কারণে আমরা চাপ প্রয়োগ করছি না। তবে আমরা নিশ্চিত তা পেয়ে যাব।
সরকারি পর্যায়ে বকেয়া মোট বিলের মধ্যে শুধু আট প্রতিষ্ঠানের কাছেই ১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা পাবে বিতরণ কোম্পানিগুলো। বাকি ২৩২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে ৪৬ প্রতিষ্ঠানের কাছে। সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে। বিভাগটির কাছ থেকে মোট ৮৬৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাবে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ বিভাগের অধীন বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়নের কাছে এসব বিল পাওনা রয়েছে।
এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবণিক বার্তাকে বলেন, বিল পরিশোধে স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। যদি তারা বিল পরিশোধ না করে, তাহলে তাদের বরাদ্দ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিল পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎ বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নিলে তার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের কোনো দায় থাকবে না বলেও জানানো হয়েছে।
বিল বকেয়া রাখার দিক থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরই রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিদ্যুৎ বিল বাবদ মন্ত্রণালয়টির মোট দেনা ২৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাছে বকেয়া রয়েছে ১১৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এরই মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধে তত্পর হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ধারাবাহিকভাবে বিল পরিশোধ শুরুও করেছে। তবে এর সংখ্যা খুবই কম। বাকিরা বিলের বিষয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে কোনো ধরনের আশ্বাস দেয়নি।
বিদ্যুতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর বকেয়া বিলের পরিমাণ বাড়লে বিদ্যুত্সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত বিদ্যুতের অবকাঠামো, সেবার মান সব বিষয় নির্ভর করে বিদ্যুত্সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর। আগে বকেয়া বিলের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে তিন গুণ বেশি ছিল। এখন ধীরে ধীরে সেটি কমে এসেছে। বিল আদায়ে বিদ্যুৎ বিভাগ তত্পরতা বাড়াচ্ছে। সেটি সফল হলে বকেয়ার পরিমাণ কমে আসবে।










