স্কুলে যাওয়ার আগে সন্তানের ব্যাগে বইয়ের পাশাপাশি ঢুকাতে হয় খাতা, কলম, পেনসিল, ইরেজার, জ্যামিতি বক্স। পড়াশোনার জন্য অপরিহার্য এসব উপকরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিক্ষা উপকরণের বাজারদর এমনভাবে বেড়েছে যে অনেক পরিবারের কাছে সন্তানের পড়াশোনার খরচ এখন আর শুধু স্কুলের বেতন, পোশাক বা যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খাতা-কলমের মতো ছোট ছোট প্রয়োজনীয় পণ্যও মাসিক সংসার ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে কাগজ ও স্টেশনারি পণ্যের বাজারেও। কয়েক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের খাতা, কাগজ, কলম ও জ্যামিতি বক্সের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোথাও পণ্যের সরাসরি দাম বেড়েছে, আবার কোথাও দাম একই রেখে কমানো হয়েছে পণ্যের আকার বা পরিমাণ। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিনতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা। রাজধানী ও বিভিন্ন জেলার কয়েকটি স্টেশনারি দোকানে ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
যশোরের বাজারে বর্তমানে ১২৪ পৃষ্ঠার একটি খাতা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। চার বছর আগে একই ধরনের খাতার দাম ছিল প্রায় ৩৫ টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এর দাম বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। ৩০০ পৃষ্ঠার খাতার দামেও এসেছে বড় পরিবর্তন। চার বছর আগে যে খাতা ৬৫ টাকায় পাওয়া যেত, এক বছর আগে তার দাম দাঁড়িয়েছিল ১০০ টাকায়। বর্তমানে সেটিই বিক্রি হচ্ছে ১১০-১১৫ টাকায়। ১৬০ পৃষ্ঠার খাতার দাম এখন ৬০ টাকা এবং ২০৪ পৃষ্ঠার খাতা ৮০ টাকা।
রাজধানীর বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারের নিঝুম কম্পিউটার অ্যান্ড স্টেশনারিতে ৮৪ পৃষ্ঠার খাতা ৩৫ টাকা, ১০৪ পৃষ্ঠার খাতা ৫৫ টাকা এবং ২০০ পৃষ্ঠার খাতা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক দিস্তা (২৪ পাতা) কাগজের দামও পড়ছে ৪০ টাকা।
অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের লেখাপড়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পণ্যগুলোর একটি খাতা। একটি শিক্ষাবর্ষে একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ধরনের খাতা। ফলে প্রতিটি খাতার দাম কয়েক টাকা করে বাড়লেও বছর শেষে পরিবারের মোট শিক্ষা ব্যয়ে তার প্রভাব পড়ে বড় অংকে।
শুধু খাতা নয়, বেড়েছে লেখার কাগজের দামও। যশোরে এ-ফোর আকারের ৭০ জিএসএম কাগজের ৫০০ পিসের এক প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকায়। ৮০ জিএসএম কাগজের দাম ৪০০ টাকা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বছরখানেক আগেও এসব কাগজের দাম গড়ে প্রায় ১০০ টাকা কম ছিল। ঢাকার বাজারে ৬৫-৭০ জিএসএম কাগজের ৫০০ পিসের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩৫০ টাকায়।
কারওয়ান বাজারের নিঝুম কম্পিউটার অ্যান্ড স্টেশনারির স্বত্বাধিকারী মো. মনির হোসেন প্রায় দুই দশক ধরে এ ব্যবসায় যুক্ত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও কাগজের দাম বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ছিল। করোনার পর থেকেই কাগজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আর কাগজের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু খাতা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ফটোকপি, প্রিন্টিংসহ শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের আনুষঙ্গিক ব্যয়ও এর সঙ্গে বাড়ছে।’
স্টেশনারি বাজারে কলমের দামেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। আগে যে কলম পাইকারি বাজারে ৪৫ টাকা ডজন দরে পাওয়া যেত, এখন তার দাম ৫০ টাকা। ৫০ টাকার ডজনের কলম বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। আর খুচরা বাজারে এসব কলমের দাম ৫-৬ টাকা। ১০ টাকা দামের কলমের এক ডজনের পাইকারি মূল্যও ১০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১০ টাকা। এদিকে বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে ৫ টাকা দামের পেনসিল। ১০ টাকা দামের পেনসিলের পাইকারি মূল্যও বেড়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজেও প্রায় একই ধরনের দর দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রিয়াজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। আমাদেরও বেশি দামে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনতে হচ্ছে। তাই বাড়তি দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।’
স্টেশনারি বাজারের আরেকটি লক্ষণীয় পরিবর্তন হলো, সব পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ছে না। কিছু পণ্যের দাম আগের মতো ৫ বা ১০ টাকা রাখা হলেও কমছে আকার ও পরিমাণ। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ রাবার। ৫ বা ১০ টাকা দামের রাবার এখনো পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর আকার ছোট হয়েছে। অর্থাৎ ক্রেতা একই পরিমাণ টাকা খরচ করলেও হাতে পাচ্ছেন তুলনামূলক কম পণ্য।
এ ধরনের পরিবর্তন সরাসরি দামের তালিকায় ধরা না পড়লেও পরিবারের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে জ্যামিতি বক্সের দাম এক বছরের ব্যবধানে ৬০ থেকে বেড়ে প্রায় ১০০ টাকায় পৌঁছেছে।
যশোরের সবচেয়ে বড় স্টেশনারি বাজার জামে মসজিদ লেনের রয়েল স্টেশনারির স্বত্বাধিকারী সাঈদ হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে কাগজ ও খাতা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজন খাতা-কলম কিনতে গিয়ে খরচের সঙ্গে সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কাগজের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ফটোকপির খরচেও। যশোরের জিলা স্কুল মোড়ের ফটোকপি দোকানি হাফিজুর রহমান বলেন, ‘কাগজ, কালি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন এক-দুই পৃষ্ঠা ফটোকপির জন্য আড়াই টাকা এবং বেশি সংখ্যক কপি করলে প্রতি পৃষ্ঠা ২ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। শহরের বাইরের অনেক জায়গায় এ দর আরো বেশি।’
শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, নোট, প্রশ্নপত্র, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা বিভিন্ন শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্রের জন্য নিয়মিত ফটোকপি করতে হয়। ফলে প্রতি পৃষ্ঠায় সামান্য বাড়তি খরচও মাস শেষে পরিবারের ব্যয়ে যোগ হচ্ছে।
স্টেশনারি পণ্যের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় চাপটি অনুভব করছেন সীমিত আয়ের পরিবারগুলো। যশোরের শংকরপুর এলাকার গৃহবধূ ইয়াসমিন আক্তারের দুই মেয়ে স্কুলে পড়ে। তার ভাষায়, ‘বাজারে খাতা-কলমের দাম হুটহাট বাড়লেও পরিবারের আয় তো সে অনুপাতে বাড়ছে না। তাই এখন প্রতিটি পণ্য কেনার আগে হিসাব করতে হচ্ছে।’
এ হিসাব শুধু একটি পরিবারের নয়। দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় অংশের মাসিক বাজেটই এখন খাদ্য, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষার মতো মৌলিক ব্যয়ের চাপে সংকুচিত। সেখানে শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে ব্যয়ের ভার তৈরি করছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন যশোর প্রতিনিধি আব্দুল কাদের










