ব্রাজিলের সাও পাওলো হাসপাতালের কোমা থেকে ফিরেছেন ফুটবলের মহানায়ক পেলে। শুনতে পেলেন ফ্রান্সের পোল্যান্ড জয়ের খবর। প্রথম টুইটেই লিখলেন, ‘ধন্যবাদ এমবাপ্পে। তোমার মাধ্যমে এ বিশ্বকাপে আমার আরো একটা রেকর্ড ভাঙতে দেখে আনন্দিত, বন্ধু।’ ছোট্ট এক টুইটেই যেন প্রকাশিত হয়ে পড়ল ফুটবলের সাম্রাজ্যে নতুন সম্রাটের পদধ্বনি। যেন তৈরি হতে যাচ্ছে নতুন রূপকথা।
পোল্যান্ডের সঙ্গে ৩-১ ব্যবধানের জয়ে ফ্রান্সের হয়ে দুটি গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফলে কেবল কাতার আসরেই তার গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে। গত আসরের চারটিসহ মোট ৯টি গোল এখন ২৩ বছর বয়সী এ ফরাসি তরুণের। সংখ্যাটা ম্যারাডোনার গোলের চেয়ে বেশি ও ব্যালন ডি’অর বিজয়ী পাওলো রোসির সমান। এখানেই শেষ না। ছাড়িয়ে গেছেন এ সময়ের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও। কিংবদন্তি পেলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে ২৪ বছরের কম বয়সী সেরা গোলদাতাও এমবাপ্পে। পেলের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ছিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে। মারাকানাজোর হতাশা কাটিয়ে ব্রাজিল তখন নতুন ছন্দ ও উদ্যমে বিভোর। টানা দুই বিশ্বকাপে ঝুলিতে তুলে নেয় চ্যাম্পিয়নের শিরোপা। ৬০ বছর আগে করা সেই রেকর্ড ভাঙার পথে এগিয়ে যাচ্ছে গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে প্রথম থেকেই তত্পর ফরাসি শিবির। সর্বশেষ আল বাইত স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে তার প্রমাণ দেখিয়েছে বিশ্বকে। তবে দিনশেষে ফ্রান্সের জয়যাত্রা যেদিকেই গড়াক, এমবাপ্পের গতি, ছন্দ, ড্রিবলিং ও ফিনিশিং নিয়ে মোহিত করে ফেলেছেন ফুটবল দুনিয়াকে। গত আসরের মতো এ আসরেও ছড়িয়ে চলছেন আলো।
২০১৮ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই টিনএজার হিসেবে জোড়া গোল করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ১৯৫৮ সালে টিনএজার পেলের রেকর্ড ৬০ বছর পর স্পর্শ করার সক্ষমতা দেখেছে পৃথিবী তার মাধ্যমে। ২০১৯ সালে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লা পারিজিয়ান’-কে দেয়া সাক্ষাত্কারে পেলেই আস্থা প্রকাশ করেছিলেন, নিজ প্রজন্মের রাজা হওয়ার সব গুণই এমবাপ্পের মধ্যে রয়েছে।
ফুটবল বিশ্বে গত এক দশক ধরেই চলে—কে সেরা, লিওনেল মেসি নাকি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো? ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে প্রবেশের পর থেকে গোল্ডেন বল ও বুটসহ প্রায় সব ধরনের পালকই যুক্ত হয়েছে দুজনের মুকুটে। কেবল বিশ্বকাপের শিরোপা প্রসঙ্গে নিয়তি নারাজ। স্বপ্ন যেন অধরাই থেকে গেল। পঁয়ত্রিশের মেসি ও সাঁইত্রিশের রোনালদোর জন্য কাতারই শেষতম আসর। মরক্কোর কাছে পরাজিত হয়ে এর মধ্যে রোনালদোর স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে আল-থুমামা স্টেডিয়ামে। যদিও নেদারল্যান্ডসকে পরাজিত করে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে মেসির আর্জেন্টিনা। মেসি ও রোনালদোর পর ফুটবলবিশ্বে যে শূন্যতা দেখা দেবে, সে সময়ের জাদুর কাঠি এমবাপ্পের হাতেই থাকবে বলে ধরে নেয়া যায়। দুটি আসর এখনো শেষ হয়ে যায়নি, কোনো ইনজুরি ছাড়া যদি পাঁচটি আসরে অংশ নিতে পারেন; যদি এ গতি, ছন্দ ও দক্ষতা ধরে রাখতে পারেন—তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অনেক রেকর্ডই যুক্ত হবে এমবাপ্পের নামের পাশে। সেমিফাইনালে মরক্কোর সঙ্গে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স। সেখান থেকেই ফুটবলের ইতিহাসে নতুন রূপকথার জন্ম নেয়া অসম্ভব না।
প্যারিসের অভিবাসী পরিবারে ১৯৯৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন এমবাপ্পে। ক্যামেরুন থেকে আসা বাবা উইলফ্রিড ও আলজেরিয়ান মা ফাইজা লামারি। ফুটবল কোচ হওয়ার কারণে উইলফ্রিড সন্তানকে ছোট থেকেই প্রস্তুত করেন। তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়নি, বেশ ভালোভাবেই সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন এমবাপ্পে। নিয়ে এসেছেন চমকের পর চমক। ২০১৫ সালে এএস মোনাকো ক্লাবের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সিনিয়র খেলোয়াড় দলে প্রবেশ করেন। ২০১৭ সালে ১৮০ মিলিয়ন ডলারে চুক্তিবদ্ধ হন পিএসজির সঙ্গে। মোনাকো থেকে পিএসজিতে যাওয়ার ঘটনাটি এখন পর্যন্ত খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয় ব্যয়বহুল ক্লাব বদলের ঘটনা। টিনএজার হিসেবে অবশ্য এটাই সর্বোচ্চ মূল্যে ক্লাব পরিবর্তন। এমবাপ্পেকে ফুটবল বিশ্বের ‘পরবর্তী পেলে’ বলে অভিহিত করেছেন আর্সেনালের সাবেক ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার। তিনি বলেছেন, সব যোগ্যতাই রয়েছে তার। অপেক্ষা শুধু সময়ের।










