দেশের পাইকারি বাজারগুলোয় ভোজ্যতেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। মূলত ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পরই দামের এ উল্লম্ফন দেখা দেয়। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি না করে ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিতিশীল করছেন। এ অভিযোগের ব্যাখ্যা চেয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। দেশের প্রধান ভোগ্যপণ্য বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সংগঠনকে চিঠি দিয়ে এ অস্থিতিশীলতার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। এর জবাব দিতে আজ বৈঠক ডেকেছেন ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন ও আমদানিতে প্রণোদনা দিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

একসময় সারা দেশের সিংহভাগ ভোগ্যপণ্যের লেনদেন হতো চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে। বর্তমানে সারা দেশে পাইকারি ব্যবসা ছড়িয়ে পড়লেও এখনো শতবর্ষী এ বাজার থেকে দেশীয় মোট চাহিদার ৫০ শতাংশের লেনদেন ও নিয়ন্ত্রণ হয়। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য কিনে ব্রোকারের মাধ্যমে লেনদেন ও দেশব্যাপী সরবরাহ করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। যার কারণে এখানকার দামের ওপর নির্ভর করে সারা দেশের ভোগ্যপণ্যের দামের উত্থান-পতন।

সম্প্রতি ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সরকারের বাজার মনিটরিং টিম ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খাতুনগঞ্জে অভিযান চালায়। সেই সময় অতিরিক্ত মুনাফা ও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির দায়ে কয়েক দফায় বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি সমিতির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের মজুদ না করা ও বেশি দামে পণ্য বিক্রি না করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে সরকারি নির্দেশনার চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে খাতুনগঞ্জে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনকে চিঠি দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

তবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করা কোনো বাজারের ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্ব নয় বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, রমজান ও বিশ্বব্যাপী পণ্যের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পর প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পরিপ্র্রেক্ষিতে আমরা খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সততার সঙ্গে পণ্যের দাম নির্ধারণে আহ্বান জানিয়েছিলাম। এ বিষয়ে সমিতির পক্ষ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তার পরও কেউ যদি নির্দেশনা অমান্য করে পণ্য মজুদ বাড়ায় কিংবা অতিমুনাফা করে তাহলে আমাদের কিছুই করার নেই।

এর আগে গত ১৭ মার্চ খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে সবাইকে সরকার নির্ধারিত দামে পাম অয়েল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতে আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করতে সম্মতও হন। কিন্তু মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে বিশ্ববাজারে বুকিং মূল্য ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যকে ছাড়িয়ে ভোজ্যতেলের লেনদেন শুরু হয়। বর্তমানে খাতুনগঞ্জে সরকারি দামের চেয়ে মণপ্রতি ১-২ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়া বিশ্বব্যাপী পাম অয়েল রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পর দাম আরো বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বিকল্প উৎস থেকে আমদানি কিংবা ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়া ছাড়া দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসে সরকারি সংস্থাগুলো। গত সপ্তাহে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের কাছে ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়। ১৯ এপ্রিল সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদের কাছে দেয়া ওই চিঠিতে সাত কার্যদিবসের মধ্যে বাজার অস্থিতিশীলতার কারণ ব্যাখ্যা করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে এ নোটিসের পরও বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি থেমে নেই।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সে দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে না। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলে সংগঠনের নেতারা বিষয়টি নজরদারি করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। ব্যবসায়ীদেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে ভোজ্যতেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে অ্যাসোসিয়েশনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার সরকার সেই দেশের স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ও দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্বব্যাপী পাম অয়েল রফতানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। শনিবার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই লেনদেন বন্ধ করে দেয় ব্রোকার ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো। রোববার দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি ব্যবসায়ীরা খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজার থেকে চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্যতেল কিনতে পারেননি। মূলত গতকাল বিশ্ববাজারের লেনদেন শুরু হলে বুকিং দর পর্যবেক্ষণ করে দেশীয় দাম নির্ধারণ হয়। তবে দাম বাড়তে থাকায় লেনদেন স্বাভাবিকের তুলনায় কম। সরবরাহ সংকট নিয়ে অনিশ্চয়তায় পাইকারি ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল করতে হলে আমদানিতে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে। এছাড়া দেশের যে শুল্ক কাঠামো আছে সেটিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে রোববার মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) পাম অয়েল আগের দিনের চেয়েও ৫০০ টাকা বেশি দামে লেনদেন হয়েছে। গতকাল সীমিত পরিসরে এসও (সরবরাহ আদেশ) পর্যায়ে পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ থেকে ৬ হাজার ২০০ টাকায়। এছাড়া পাইকারি পর্যায়ে (মিলগেট থেকে উত্তোলন হওয়া ভোজ্যতেল) ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে সয়াবিনের এসও লেনদেন হয়েছে মণপ্রতি ৭ হাজার টাকায়। যদিও পাইকারিতে খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি সাড়ে ৭ হাজার টাকায়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া নোটিসের বিষয়ে আজ সমিতির কার্যালয়ে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, মতবিনিময়ে নোটিসের জবাব দিতে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

দেশে ভোজ্যতেলের বাজারের একক আধিপত্য রয়েছে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান, এসও ব্যবসায়ী ও ব্রোকারদের কাছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য আমদানি করে এসওর (সরবরাহ আদেশ) মাধ্যমে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি করে দেয়। অন্যদিকে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো এসব এসও সরকারি কিংবা স্লিপের মাধ্যমে এসও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। এই বিক্রি প্রক্রিয়ায় জড়িত রয়েছে হাজার হাজার ব্রোকার। ফলে একটি এসও আমদানিকারকের কাছ থেকে কেনার পর নানা হাতবদলের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফায় শেষ পর্যন্ত পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছে। যার কারণে দেশের বাজারে সংকট কিংবা বৈশ্বিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভোজ্যতেলের দাম কারসাজির সুযোগ তৈরি হয় পাইকারি বাজারগুলোয়। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাতুনগঞ্জ ছাড়াও ঢাকার মৌলভীবাজারে এসও লেনদেন খুবই জনপ্রিয় একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী মো. গোলাম মাওলা বণিক বার্তাকে বলেন,  ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা। বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, মিল থেকে সরবরাহ সংকট ও মিল থেকে বেশি দামে কিনলে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। দাম বাড়ার জন্য গোটা সিস্টেম দায়ী থাকলেও প্রশাসনের নজরদারি কেবল পাইকারি বাজারের ওপর। কেউ যদি ভোজ্যতেলের মজুদ থেকেও বিক্রি না করে তাহলে সমিতির পক্ষ থেকে কিছুই করার নেই। সরকারের উচিত শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়াও ভোজ্যতেল আমদানিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।