জ্বালানি চাহিদা পূরণে বিশ্ববাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমেই স্বাভাবিক হচ্ছে। স্পট মার্কেটে দরপতনে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম এখন ১৪ ডলারে ওঠানামা করছে, যা গত বছরের আগস্টে সর্বোচ্চ ৭০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। দাম কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা শুরু করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। ওমানের সঙ্গে পেট্রোবাংলার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে, তবে এরই মধ্যে দেশটি থেকে এ চুক্তির পুরোপুরি এলএনজি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারও সরবরাহ বাড়াতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এসব আমদানির বিল পরিশোধে যে বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হবে, সে সংস্থান হবে কিনা বা হলেও কীভাবে হবে, সেটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

ডলার সংকটের কারণে এরই মধ্যে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকায় দুই জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া ও চীনা প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক এরই মধ্যে বিপিসিকে জ্বালানি তেল সরবরাহে আপত্তি জানিয়েছে। ডলার সংকটে বর্তমানে দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত বিদেশী কোম্পানির (আইওসি) গ্যাসের দাম পরিশোধ করতে পারছে না পেট্রোবাংলা। কোম্পানিটির কাছে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসের গ্যাস বিল বাবদ ১৫ কোটি ডলার বকেয়া পড়ে আছে শেভরনের। আমদানিতে ডলার সংকটে ঋণপত্র (এলসি) খোলার এ জটিলতা শিগগিরই নিরসনের সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা। ফলে জ্বালানি হিসেবে দেশে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা গেলেও বিল পরিশোধ সংক্রান্ত বিষয়টিতে উদ্বেগ থেকে যাচ্ছে। ডলার সংকটের বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে এলএনজি আমদানি সরবরাহের এ চ্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না এ খাতের সংশ্লিষ্টরা।

স্পট মার্কেট থেকে আগামী জুন পর্যন্ত ১০-১২ কার্গো এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগের। বর্তমানে প্রতি কার্গো এলএনজি ৬০০-৬৫০ কোটি টাকায় ক্রয় করছে পেট্রোবাংলা। প্রতিষ্ঠানটিতে এ অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হচ্ছে। জুন পর্যন্ত যদি ১২ কার্গো এলএনজি কেনা হয় এবং দামের যদি কোনো তারতম্য ঘটে, সেক্ষেত্রে ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বিপুল পরিমাণ এ অর্থ বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিশোধ করার মতো সক্ষমতা ব্যাংকগুলোর নেই বলে জানিয়েছেন ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা।

স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম যেমন কমেছে, তেমনি বাড়তি এলএনজি বিক্রির আশ্বাসও দিয়েছে কিছু দেশ। এর মধ্যে অন্যতম ওমান। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। বর্তমানে ওমান থেকে বছরে ১০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। যদিও চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টন এলএনজি দেয়ার কথা। চুক্তি সম্প্রসারিত হলে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ওমান থেকে চুক্তির বাকি পাঁচ লাখ টন এলএনজি পাওয়া যাবে।

পেট্রোবাংলার নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমানের কাছ থেকে এলএনজি পাওয়ার জোর চেষ্টা চালানো হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ওমান আরো পাঁচ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পেট্রোবাংলার সঙ্গে ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের (ওকিউটি) সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। ওই বৈঠকে এ-সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম শেষ হয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ওমান থেকে বাড়তি এলএনজি পাওয়ার আশ্বাস আমরা পেয়েছি। এ-সংক্রান্ত সব ধরনের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। মূল্যসংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে ওমানের দিক থেকে একটা আশ্বাস পাওয়া গেলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাবে।’

দেশের জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে দৈনিক ২৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে ৭২-৭৩ কোটি ঘনফুট। দেড় মাস আগেও যেখানে গ্যাসের সরবরাহ ছিল ৪০-৪২ কোটি ঘনফুটের মতো। কাতার ও ওমান থেকে পেট্রোবাংলা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ভিত্তিতে এ এলএনজি আমদানি করছে।

তবে পেট্রোবাংলার অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় এলএনজি পাওয়া গেলেও বিল পরিশোধ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। বিশেষত স্থানীয় গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত আইওসি (বিদেশী কোম্পানি) গ্যাসের বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ডলার সংকটের কারণে গ্যাস বিল পরিশোধেও বিলম্ব হচ্ছে।

ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি তেল আমদানিতে এলসির দায় পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে বিপিসি। কয়েকদিন আগেও জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া এবং চীনা প্রতিষ্ঠান ইউনিপেকের কাছে সংস্থাটির বকেয়া ছিল ২৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। বকেয়া বিল পরিশোধে বিপিসিকে চিঠি দেয়ার পাশাপাশি বৈঠকও করেছে। এমনকি বকেয়া পরিশোধ না করা হলে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করার কথাও ওই চিঠিতে জানানো হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরবরাহকারী দেশ দুটি জ্বালানি তেল দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে বিষয়টি এমন নয়। ডলার সংকটের কারণে এলসি সেটেলমেন্টে সব ক্ষেত্রেই কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি করেছে। তারাও বিপিসির বড় সরবরাহকারী। ফলে তাদের ভেতরেও একটা উদ্বেগ থাকবে এটি স্বাভাবিক।’

জ্বালানি তেলের বকেয়া বিল পরিশোধ না করা হলে প্রতিষ্ঠান দুটির তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির শীর্ষ এ কর্মকর্তা বলেন, ‘জ্বালানি তেল সরবরাহ না করার বিষয়ে এখনো তারা আমাদের কিছু বলেনি। বকেয়া পাওনার কথা জানিয়েছে, আমরা এরই মধ্যে বড় একটি বকেয়া বিল পরিশোধও করে দিয়েছি। এটি চলমান প্রক্রিয়া। বিপিসির জ্বালানি তেল রফতানিকারকের মধ্যে এ ধরনের প্রসেস থাকেই। পেমেন্টের ক্ষেত্রে আগে যেখানে একবারে পরিশোধ করা হতো, এখন ডলার সংকটের কারণে সেটি দু-তিন কিস্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিসির দুজন কর্মকর্তা জানান, ২০২০ সাল থেকে বিপিসিকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে ভিটল এশিয়া ও ইউনিপেক। তেল সরবরাহের পর ভিটল এশিয়া বিপিসির কাছে ১৫ কোটি ২৬ লাখ ডলার পাওনা ছিল। বকেয়া পরিশোধ না করলে জ্বালানি তেল সরবরাহে প্রতিষ্ঠানটি আপত্তি তোলে। এরপর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভিটল এশিয়ার কর্মকর্তারা বিপিসির সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠকের পর ভিটল এশিয়াকে সর্বশেষ ৮ মার্চ ৩ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। এদিকে ইউনিপেকের বকেয়া পরিশোধ না করায় ৪ মার্চ ডিজেল বোঝাই জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে পারেনি বিপিসি। ৫ মার্চ বিপিসি ইউনিপেককে ৬ কোটি ২২ লাখ ডলার পরিশোধ করা সাপেক্ষে পরে বন্দর থেকে কার্গোটি ছেড়ে দেয়। বিষয়টি নিয়ে পরের দিন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিপিসি।

দেশের ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র খোলা থেকে শুরু করে বিদেশী ঋণের কিস্তি পরিশোধ জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমনকি ডলার সংকটের কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা আমদানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন শিল্পমালিকরা।

২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের আমদানির ধাক্কায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৫ থেকে বেড়ে ১১৪ টাকা পর্যন্ত ওঠে। আর খুচরা বাজারে ডলারের দাম ওঠে ১২০ টাকা পর্যন্ত। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে ডলারের দাম বর্তমানে কিছুটা কমে এসেছে। গতকাল ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য ছিল ১০৬ টাকা।

আমদানি দায়ের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য অব্যাহতভাবে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে প্রায় ৭৫০ কোটি (সাড়ে ৭ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করা হয়। চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি বিক্রি করেছে। ২০২১ সালের আগস্টে ৪ হাজার ৮০০ কোটি (৪৮ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত হওয়া রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩ হাজার ১০০ কোটি (৩১ বিলিয়ন) ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী, রিজার্ভের হিসাব করলে নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২ হাজার ৩০০ কোটি (২৩ বিলিয়ন) ডলারে নেমে আসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় প্রতিদিনই ডলার বিক্রি করা হলেও বাজারে সংকট কাটছে না। উল্টো দেশের অনেক ব্যাংকই ডলার সংকটে এলসি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নিজে থেকেও আমদানির নতুন এলসি খোলা কমিয়ে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) আমদানির নতুন এলসি খোলা কমেছে ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে কঠোর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এলসি নিষ্পত্তি কমানো সম্ভব হয়নি। বরং অর্থবছরের প্রথমার্ধে আমদানির এলসি নিষ্পত্তি ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে গেছে। আগে খোলা এলসির দায় সমন্বয় করতে বাধ্য হওয়ায় এলসি নিষ্পত্তির চাপ কমানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা।