দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ পর্ষদ বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো থেকে শুরু করে সংবিধি, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও বাজেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তেরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় এ পর্ষদ। আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটির রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি) নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও দেশের প্রায় অর্ধেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টই এখনো আরজেএসসি নিবন্ধনের বাইরে থেকে গেছে। তাই এবার আরজেএসসি নিবন্ধনবিহীন এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টির কার্যক্রমের আইনগত বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিওটি গঠন করতে হবে। এ কমিটি হতে হবে ৯ থেকে ২১ সদস্যের। সোসাইটিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী এ ধরনের ট্রাস্টের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আরজেএসসি থেকে নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আরজেএসসির নিবন্ধন রয়েছে ৫০-৬০টির। সে হিসেবে প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টেরই কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত বৈধতা নেই।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে নয়টি শর্ত দেয়া হয়েছে। এর প্রথমটিই হলো বিওটি সংক্রান্ত। আর সোসাইটিজ অ্যাক্টের একদম শুরুতেই এ ধরনের ট্রাস্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে আরজেএসসির নিবন্ধন নেয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। তাই আরজেএসসির অনুমোদন না নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করলে সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
ইউজিসি বলছে, বিওটির অধীনে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায়, অনুমোদনের পর কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় বিওটির সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা মতানৈক্য তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটির সদস্যরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মূল উদ্যোক্তা দাবি করেন। এমনকি ট্রাস্টিরা আলাদা ক্যাম্পাসও খুলে বসেন বলে অনেক সময় দেখা গেছে। তাই আরজেএসসির নিবন্ধনের বিষয়টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।
আরজেএসসির নিবন্ধন না থাকা বিওটির কোনো প্রস্তাব বা আবেদন আমলে না নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি। এ সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের প্যানেল প্রস্তাবসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আবেদন আসে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে। বর্তমানে এসব আবেদনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিওটির পক্ষ থেকে আরজেএসসির নিবন্ধনের সনদও চাওয়া হচ্ছে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড সেটি জমা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের কোনো প্রস্তাবই আমলে নেয়া হচ্ছে না।
আরজেএসসির নিবন্ধন না থাকা বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৬ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এখন পর্যন্ত আরজেএসসির নিবন্ধন নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ড। সে হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্ষদের আইনগত বৈধতাই নিশ্চিত হয়নি।
আরজেএসসি নিবন্ধন পায়নি ঢাকার ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডও। বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০০৩ সালে আরজেএসসির নিবন্ধিত ফাউন্ডেশনের আওতায় ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অনুমোদন হয়। ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংস্কার হলে ট্রাস্ট গঠন করা হয়, যা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে নিবন্ধন করা হয়। এরপর আরজেএসসির নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে, তবে বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন।
একইভাবে চট্টগ্রামের ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই ট্রাস্টি বোর্ডের নিবন্ধনের জন্য আরজেএসসিতে আবেদন করেছেন তারা। সেটিও প্রক্রিয়াধীন।
এদিকে আইনে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত সদস্য নিয়ে গঠন করার কারণেও বৈধতা হারিয়েছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়। আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটির সর্বোচ্চ সদস্য হতে হবে ২১ জন। যদিও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বিওটির সদস্য সংখ্যা ৩০-এর বেশি। এছাড়া পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিওটিতে বর্তমানে সদস্য রয়েছেন ২৫ জন। আর বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বলছে, তাদের বিওটির সদস্য সংখ্যা ২৮।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিলসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদ ও পদগুলো আইনের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ পর্ষদ ও পদগুলোর কার্যক্রমও আইনগতভাবে গঠন, নিয়োগ ও পরিচালিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেসব পর্ষদ ও পদের আইনগত বৈধতা নেই, কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের প্রস্তাব আমলে না নেয়াই আইনসম্মত বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের এ অধ্যাপক।
দেশের বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রথম অনুমোদন দেয়া হয় ১৯৯২ সালে। ওই সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হতো ফাউন্ডেশনের অধীনে। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ট্রাস্ট গঠনের কথা বলা হয়। এরপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ (ইউআইইউ) শীর্ষস্থানীয় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ট্রাস্ট গঠন করে সেটির আরজেএসসির নিবন্ধন সম্পন্ন করে।
এ বিষয়ে ইউআইইউর পরিচালক সমন্বয়কারী ও সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এএসএম সালাহউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, আরজেএসসির নিবন্ধন না থাকলে তো ট্রাস্টের কার্যক্রমের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এজন্য আমরা সংশোধিত আইন পাস হওয়ার পর পরই দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরজেএসসির নিবন্ধনের উদ্যোগ নিই। এক বছরের মধ্যেই ইউআইইউর ট্রাস্ট আরজেএসসির নিবন্ধনের আওতায় চলে আসে। কার্যক্রমে স্বচ্ছতার জন্য সব বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই আরজেএসসির নিবন্ধন নেয়া প্রয়োজন।










