দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো এলাকায় গ্রোসারির ব্যবসা করেন বাংলাদেশের ইকরাম হোসেন। ১৫ বছর ধরে ওই এলাকায় বেশ সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছেন তিনি। করোনার প্রথম সংক্রমণে ব্যবসার লোকসান কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দ্বিতীয় সংক্রমণে ব্যবসায়ে লোকসানে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। করোনার ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে আগের মতো নেই বিক্রি। নেই ক্রেতা সমাগমও।
এমন অবস্থা ব্লুমফন্টেইনের হোটেল ব্যবসায়ী আবুল কাসেমেরও। করোনায় দেশটিতে বিদেশী পর্যটক কমে যাওয়ায় প্রায় আট মাস ধরে ব্যবসা নেই তার প্রতিষ্ঠানে। পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন আশায় মাসের পর মাস কর্মচারীর বেতন, হোটেল ভাড়া এবং ইউটিলিটি চার্জ দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ব্যবসা বন্ধের পথে তার।
এমন দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করা প্রায় সব বাংলাদেশী ব্যবসায়ীই। দেশটিতে গ্রোসারি ব্যবসা করছেন এমন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, করোনায় দ্বিতীয় সংক্রমণ শুরু হওয়ায় দ. আফ্রিকাজুড়ে লকডাউনের সর্বোচ্চ কঠোরতা (লেভেল-২) আরোপ করা হয়েছে। দোকানপাট খোলার অনুমতি থাকলেও আগের মতো নেই ক্রেতা। মাসের পর মাস ব্যবসায় দৈন্যদশা চলছে। অনেকে লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে এরই মধ্যে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এসব বাংলাদেশীর বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাইকমিশন বলছে, ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় সরকারিভাবে আর্থিক সুবিধা দেয়ার সুযোগ তাদের কাছে নেই।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে এসেছেন ৭১ জন বাংলাদেশী পুরুষ। ফেরত আসা প্রায় সবাই প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ককে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের ফিরে আসতে হয়েছে।
তবে এটি করোনার প্রথম সংক্রমণের শুরু থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। তবে ডিসেম্বরে মহামারী ব্যাপক আকার ধারণ করলে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুই শতাধিক বাংলাদেশী ফিরতে বাধ্য হয়েছেন বলে সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশীরা জানিয়েছেন। এসব বাংলাদেশীর বেশির ভাগই সেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত ছিলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশটিতে অন্তত আড়াই থেকে তিন লাখ বাংলাদেশী বসবাস করছেন। তবে তাদের কাছেও এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বেশির ভাগ প্রবাসী রাজধানী জোহানেসবার্গ, কেপটাউন, ব্লুমফন্টেইন, ডারবান ও প্রিটোরিয়ায় থাকেন।
দেশটিতে বসবাস করা এসব বাংলাদেশীর ৯০ শতাংশ বিভিন্ন প্রদেশের শহরে ব্যবসা করেন। গ্রোসারি, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুডসহ নানা ধরনের ব্যবসা করেন তারা। দ্বিতীয় পর্যায়ে মহামারীর কারণে গ্রোসারি ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা সীমিত থাকলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারছেন না তারা। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রদেশে ছোট শহরগুলোয় যেসব বাংলাদেশীরা ব্যবসা করেন তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।
কেপটাউনের লোকেশনভিত্তিক ব্যবসা করেন এমন কয়েকজন বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনায় সরকারের কঠোরতা আরোপ থাকায় প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হন না কেউ। তাছাড়া এসব জায়গায় দিন ও রাতের নির্দিষ্ট একটি সময় বেচাকেনা হয়। সরকার কারফিউ জারি করায় প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা হচ্ছে না। অনেকে দেশে পরিবার এবং বসবাসের খরচ মেটান এ দোকান চালিয়ে। কিন্তু এখন প্রতি মাসে লোকসান হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন শত শত ব্যবসায়ী। অনেকে পুঁজি হারিয়ে দেশে ফিরে গেছেন। তাছাড়া ব্যবসায়ীদের দোকানে হামলা, খুন এবং ডাকাতির মতো ঘটনা তো অব্যাহত রয়েছেই। করোনায় বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় হামলা ও খুনের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব কাজল মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার শুরুতে বাংলাদেশীদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক ছিল। দ্বিতীয় সংক্রমণে সেটি আরো বেড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেচাকেনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ব্যবসা না থাকায় অনেকে দেশে চলে গেছেন। করোনার নতুন উপসর্গ পাওয়া গেছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এটি আরো বেশি প্রাণঘাতী। গত এক সপ্তাহে চারজন বাংলাদেশীর মৃত্যুতে অনেকে ভয়ে বাইরে বের হচ্ছেন না।
দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নূরে হেলাল সাইফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, করোনায় আক্রান্ত বাংলাদেশীদের জন্য মিশনের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ কোনো কর্মসূচি নেই। তবে এ দেশের বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত ৩০-৪০ জন বাংলাদেশী চিকিৎসক কর্মরত আছেন। করোনায় কোনো বাংলাদেশীর সহযোগিতা প্রয়োজন হলে তারা অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসা দেবেন, এমনকি দিচ্ছেনও।










