নতুন করে বৃষ্টিপাত না হলেও গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর পানি আশঙ্কাকাজনকভাবে বাড়ছে। এতে করে ভাঙন দেখা দিয়েছে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামগুলোতে। এরই মধ্যে ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে তলিয়ে যাবার পথে অর্ধশত পরিবারের ঘরবাড়ি। এ দিকে নদী ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নীরব বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এলেই নদী ভাঙনে বাস্তুচ্যুত হবার শঙ্কা নিয়ে দিন কাটে ঘোড়াঘাট পৌর এলাকার নাপিতপাড়া, হিন্দুপাড়া ও বড়গলি গ্রামের শতাধিক পরিবারের। বিগত বছরগুলোতে এই তিনটি গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষাকালে জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে অভিযোগ করেও কোন সুফল পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। কর্তৃপক্ষের দেয়া আশ্বাসের অপেক্ষায় থেকে নদী ভাঙনে হারিয়ে গেছে পৈত্রিক ভিটেমাটি।

করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এ বছরও নদীগর্ভে হারিয়ে যাবার পথে ১৫ থেকে ২০টি পরিবারের আবাসস্থল। দিন এনে দিন খাওয়া নিম্ন আয়ের এসব অসহায় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হাট-বাজার ও রাস্তাঘাটে বুট-বাদাম বিক্রি করে সংসার চালায়। মাথা গোঁজার শেষ ঠাইটুকু হারালে পথে বসতে হবে তাদের।

গত বছর গ্রাম তিনটি পরিদর্শ করেছেন নিাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক। নদী ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই আশ্বাস আর বাস্তবায়নে রূপ নেয়নি।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, গ্রামগুলোর ধার দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ভাঙনে নদীর পানি বাড়িঘরের কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এসব গ্রামের একাধিক বাড়ির অর্ধেক পর্যন্ত ভেঙে নদীতে হারিয়ে গেছে। বাড়িগুলোর অবশিষ্ট ঘরে গবাদিপশু নিয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছে অসহায় পরিবারগুলো।

ঘর হারানো বৃদ্ধা মালতি রানী বলেন, ‘আমার আর কিছু নেই। ভাঙা ঘরে বৃষ্টিতে পানি প্রতো। সেই পানি পরা ঘরও নদীতে হারিয়ে গেছে। কোথায় থাকবো, কী করবো কিছুই ভেবে পাচ্ছিনা। গরীবের কষ্ট কেও দেখে না।’

নিতাই সাহা বলেন, ‘প্রতিবছর এমপিকে জানাই। মেয়রের কাছে যাই। পানি উন্নয়ন বোর্ডে চিঠি দেই। কিন্তু দিনশেষে ফলাফল শূন্য। সবাই শুধু আশা দিয়ে যায়। হবে হচ্ছে আরো কত কী। গত বছর এমপি এসে আমাদের অবস্থা দেখে গেছেন। ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে তিনি যাওয়ার পর আমাদেরকে শুধু চাল আর ডাল দেয়া হয়েছে। ঘরবাড়ি রক্ষায় কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

শান্তি রানী নামে আরেক গৃহবধূ বলেন, ‘নদীর পানি আমাদের ঘরের নিচে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। রাতে আমরা ভয়ে ঘুমাতে পারি না। এই কখন বুঝি ঘরসহ নদীতে ডুবে যাই। দিনে রান্না করতে গেলে আতঙ্কে থাকতে হয়। রান্না ঘর থেকে মাঝেমাঝে ভয়ে রান্না ছেড়ে পিছিয়ে আসি। সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমাদের বাঁচান।’

ঘোড়াঘাট পৌরসভার মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলন বলেন, দু’দিন আগেও ভুক্তভোগীরা আমার কাছে এসেছিলেন। আমি আমাদের সংসদ সদস্যকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানিয়েছি। পৌরসভার পক্ষ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার চিঠি দেয়া হয়েছে। নদী শাসনের মাধ্যমে নদী ভাঙন ঠেকাতে না পারলে পৌরসভার একাধিক ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। আমি আবারো আমাদের সংসদ সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহম্মেদ বলেন, আমি এই জেলায় নতুন। পৌর মেয়রের কাছে থেকে বিষয়টি জেনেছি। আমি গ্রামগুলো পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। সেখান থেকে অনুমোদন পেলেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।