সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় শ্যামনগর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। বিদ্যুৎ সংযোগ যাওয়ার পর ওই এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয় অন্তত ১০-১৫ বার। দুর্যোগে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনেও বিপর্যয় ঘটে বেশ কয়েকবার। একক উৎস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সংযোগ টেনে নিয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে উপকূলবর্তী এলাকা।
তবে এ অবস্থা উপজেলার গাবুরা এলাকায়ই নয়, পুরো জেলায় বিদ্যুতের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখা যায় ঝড় কিংবা বন্যায়। গত ৩০ জুলাই নিম্নচাপের কারণে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে পড়ে জেলার অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ গ্রাহক। ঝড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুত্হীন থাকে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সন্তোষ কুমার সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, নিম্নচাপ হওয়ায় গত ৩০ জুলাই বিদ্যুতের লাইন বিপর্যয় হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এজন্য সাময়িকভাবে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখেছিলাম। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা চালু করে দেয়া হয়।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সাতক্ষীরার মতো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও যশোর অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন চিত্র নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় প্রায়ই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখছে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি বছর আঘাত হানবে—এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও গতানুগতিক পদ্ধতিতে বৈদ্যুতিক লাইন টানা হয়েছে সেখানে। যে কারণে দুর্যোগের আশঙ্কায় প্রায়ই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
উপকূলীয় জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সেবা দিচ্ছে মূলত বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি হিসেবে বিদ্যুতের উন্নয়নে নতুন লাইন নির্মাণ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বসানো এবং গ্রাহক সংযোগ বাড়ালেও স্থায়ী ও টেকসই কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি বিতরণ কোম্পানিগুলো।
দেশের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতার কথাও স্বীকার করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ। সংস্থাটি সারা দেশের সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও করোনায় ধীরগতি নেমেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প নিয়েছে ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো ও আরইবি। ‘ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট আপ টু ২০৩০’ নামে ওজোপাডিকোর দুটি প্রকল্পের সমীক্ষা যাচাইয়ে পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে। বিতরণ লাইন উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় আরইবি বৈদ্যুতিক খুঁটির উচ্চতা বৃদ্ধি, দ্বৈত বিদ্যুৎ উৎস, বিতরণ লাইনের তার আবৃত করা ও স্বল্প দূরত্বে খুঁটি বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
আরইবি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলায় বিদ্যুতের ২২ লাখ ৮২ হাজার গ্রাহক রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের বিতরণ লাইন রয়েছে ৩৫ হাজার কিলোমিটার। বেশির ভাগ বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের খুঁটির উচ্চতা ১৩০-১৪০ ফুট। বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এলাকায় পানি বাড়লে খুঁটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। একই সঙ্গে এসব এলাকার সঞ্চালন লাইন ও বিতরণ লাইনের দুর্ঘটনা এড়াতে বৈদ্যুতিক তারে কোনো কাভার ব্যবহার করা হয়নি। একটি খুঁটি থেকে আরেকটি খুঁটির দূরত্ব অনেক বেশি। ফলে বৈদ্যুতিক লাইনে বাতাস বেঁধে অনেক ক্ষেত্রে লাইন ছিঁড়ে যায়।
আরইবির সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আমজাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো আবহাওয়া পরিবর্তন। প্রায়ই দক্ষিণাঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। বৈদ্যুতিক খুঁটির উচ্চতা কম হওয়ায় এবং বিতরণ লাইনের তারে কাভার না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটে অনেক বেশি। যে কারণে জানমালের ক্ষতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হয়।
সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রাহকরা বলছেন, বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর গাছের ডাল পড়া, দুর্বল খুঁটির মাধ্যমে সংযোগ টানা ও পুরনো ট্রান্সফরমারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করায় প্রায়ই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিতরণ লাইনের নিয়মিত তদারকি না থাকার কারণেও তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রতি বছর ৩-৪ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছরের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে পল্লী বিদ্যুতের ২৬ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ২ হাজার ৭০০ বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যায়, ট্রান্সফরমার পুড়ে যায় ৭৬০টি, বিদ্যুতের ১৯ হাজার কিলোমিটার লাইন পুড়ে যায়। এর বাইরে ৩৩ হাজার ৬০০ জায়গায় সরবরাহ লাইনের তার ছিঁড়ে যায়।
বিদ্যুতের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা ‘ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ নামে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলে যেসব বিতরণ কোম্পানি রয়েছে, সেগুলোর বিদ্যুৎ বিতরণে টেকসই ব্যবস্থা তৈরি করা। মূলত বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলো তাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, আমরা তাদের অভিজ্ঞতাটাকে কাজে লাগাতে চাই।










