খুলনার উপকূলীয় জনপদ কয়রা উপজেলায় ক্রমেই লবণাক্ততা বাড়ছে। উর্বরতা কমে যাচ্ছে ফসলি জমির। সমুদ্রে পানির উচ্চতা ক্রমেই বাড়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে এ জনপদ রক্ষায় বাঁধ সংস্কার ও টেকসইকরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় কাজটি শুরু হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর। তবে এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজই বাকি রয়েছে। এরই মধ্যে এক বছর সময় বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা ও সাতক্ষীরা-২ বিভাগ। এ দুটি বিভাগ থেকে দরপত্রের মাধ্যমে ২৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করার অনুমতি পায়। প্রকল্পের আওতায় কয়রা উপজেলার চারটি নদীর তীরবর্তী এলাকায় নির্মিত ১২৭ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও টেকসইকরণের কাজ হবে। সেক্ষেত্রে বাঁধের উচ্চতা ও প্রশস্ততা বাড়ানো, ঢাল সংরক্ষণ, নদী শাসন ও চর বনায়ন করা হবে। বর্তমানে ৩২ কিলোমিটার সংস্কারকাজ চলমান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই নিজেরা কাজ না করে অন্যদের দিয়ে করাচ্ছে। এ কারণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজ নেয়া এসব সহঠিকাদারের অনভিজ্ঞতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণেও প্রকল্পের কাজে গতি নেই।

তবে পাউবো কর্মকর্তারা বলছেন, কার্যাদেশ পেতে দেরি ও কাজ অনুযায়ী বরাদ্দ ছাড় না পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পটি শেষ করতে পারছেন না তারা।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও পাউবো খুলনা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই বছর আগে প্রকল্পটি অনুমোদন হলেও দাপ্তরিক জটিলতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। যে কারণে নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কিছু স্থানে মাটির কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। কিছু স্থানে বালির বস্তা রাখা হয়েছে। আবার কয়েকটি জায়গায় সিসি ব্লক তৈরির কাজ চলছে।

আংটিহারা গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা কাজ না করে অপেক্ষা করতে থাকেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য। দুর্যোগের পর ঠিকাদার বলেন, কাজ তো করেছিলাম, কিন্তু সব ভেসে গেছে জলোচ্ছ্বাসে। এভাবে প্রতিবারই কাজ না করে বিল তুলে নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, স্থানীয় জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ সংস্কার করেন, আর বিল তুলে নেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।’

অভিযোগ রয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ সংস্কারের নামে পাউবো দরপত্র ছাড়াই নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। তবে সেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁধ মেরামতের কাজ না করে অর্ধেক দামে স্থানীয় সহঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। সহঠিকাদাররাও সে কাজ না করে চুক্তিবদ্ধ হওয়া দামের অর্ধেক দিয়ে শ্রমিক সর্দারদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেন। শ্রমিক সর্দাররা স্থানীয় শ্রমিকদের মাধ্যমেই সে কাজ করিয়ে নেন। এভাবে কয়েক হাত ঘুরে প্রকল্পের মূল টাকার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যয় হয় বাঁধ মেরামতে। বাকি টাকা চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে। যার অংশ পাউবোর কিছু কর্মকর্তাও পান।

সরজমিনে কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের আংটিহারা গ্রামের হারেজখালী ক্লোজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ২ হাজার ৮৭০ মিটার বাঁধ নির্মাণে মাটির কাজ চলছে। মেসার্স মোজাফফর এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনে নিয়ে ইসরাফিল হোসেন ওই কাজটি করছেন। প্রায় ১২ কোটি টাকা বরাদ্দের এ কাজটি তিনি ৬ কোটি টাকায় চুক্তি করে নিয়েছেন। সহঠিকাদারের আর্থিক সংকট থাকায় এখন সেখানে কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।

এ বিষয়ে মূল ঠিকাদার মোজাফফর হোসেন মন্টু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। সহঠিকাদার ইসরাফিল হোসেন কাজ কিনে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কত টাকায় চুক্তি করেছেন—এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

প্রকল্পের মাটিয়াভাঙ্গা থেকে আংটিহারা পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মিটার বাঁধ নির্মাণকাজ করছে মেসার্স আমিন অ্যান্ড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি মাটির কাজ শেষ করে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজে হাত দিয়েছে। এছাড়া শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী গাতিরঘেরি এলাকায় ১ হাজার ৪০০ মিটার বাঁধ নির্মাণকাজ করছে এমএম বিল্ডার্স। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু স্থানে মাটির কাজ করা হয়েছে। বাঁধের পাশে সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এর একটু দূরে কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী গাজীপাড়া এলাকায়ও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে এখন পর্যন্ত মাটির কাজ শুরু হয়নি। নদীতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে।

এদিকে কয়রা উপজেলা সদরের কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী হরিণখোলা গ্রামে বাঁধের ৩০০ মিটার অংশ ধসে পড়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে পাশের আরো ৫০০ মিটার। এতে হুমকিতে পড়েছে বাঁধসংলগ্ন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। কয়েক হাজার একর আমন ধানের খেত ও অসংখ্য মাছের ঘের নোনাপানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়রা বাসিন্দারা জানান, ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ওই গ্রামগুলোর প্রায় দুই কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে কপোতাক্ষ নদে তলিয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ১ হাজার ৭০০ মিটার বেড়িবাঁধ। তবে বছর না যেতেই ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর ঘাটাখালী গ্রামের অংশে ভাঙন দেখা দেয়। সেখানে ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনরায় ১৩০ মিটার রিং বাঁধ নির্মাণ ও জিও ব্যাগ স্থাপন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরপর ২০২৩ সালে বাঁধটির ২ নম্বর কয়রা গ্রামের ২০০ মিটার অংশ নদে ধসে পড়ে। সেখানে এখনো সংস্কারকাজ চলছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হরিণখোলা গ্রামে বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার ধসে পড়ে।

এ ব্যাপারে খুলনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়রার বাঁধ এতদিন সাতক্ষীরা পাউবোর আওতাধীন ছিল। আগে কী কী হয়েছে, জানি না। খুলনা পাউবো দায়িত্ব নেয়ার পর বাঁধটি পুনরায় সংস্কার প্রকল্প অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।’