১২ কেজির সিলিন্ডার ঘোষিত দামের চেয়ে বাজারে ৪০০-৫০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ সংকট জানুয়ারির চেয়ে কিছুটা কমলেও দাম নিয়ে এখনো অসন্তুষ্টি রয়েছে ভোক্তাদের মধ্যে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর-১, শ্যামলী, কারওয়ান বাজার, মুগদা এবং ঢাকার বাইরের কয়েকটি শহরের খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অপারেটররা বলছেন, বাজারে গত মাসে এলপি গ্যাসের যে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল তা এখন আর নেই। তবে এলপিজির জন্য বিইআরসি ঘোষিত দাম বাস্তবায়ন নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এলপিজির সরবরাহ পরিস্থিতি আগামী মাসে স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উৎস থেকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। সরবরাহ বাড়লে দামও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে আশা তাদের।
দেশের বাজারে প্রতি মাসে গড়ে এলপিজি চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টন। গত জানুয়ারিতে পণ্যটির সরবরাহ ছিল ১ লাখ টনের নিচে। চলতি ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৭৬ হাজার টন এলপিজি এসেছে দেশে। এ মাসে অর্ডারকৃত এলপিজির পুরোটা দেশে এলে তা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টনের কাছাকাছি চলে যাবে। এলপিজি আমদানি বাড়ার কারণে বাজারে এখন পণ্যটির তীব্র সংকট নেই বলে জানিয়েছেন অপারেটরা। তবে বাড়তি দাম নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তির বিষয়টি তারা অস্বীকার করেননি।
জানতে চাইলে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে এলপি গ্যাসের সংকট এখন আর অস্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পণ্যটির সরবরাহ ও দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজার মনিটরিং করতে হবে। এটা মাঠ পর্যায়ে তদারকির জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দরকার।’
তিনি দাবি করেন, খুচরা বিক্রেতারা বাজারে পণ্যটি বিক্রিতে হয়তো ৫০-১০০ টাকা বেশি রাখছেন। দাম (১২ কেজি সিলিন্ডার) এখন ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকার বেশি নয়।
বাজারে সংকটের তীব্রতা না থাকলেও এলপিজির সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় খুচরা বিক্রেতারা এলপিজি বিক্রি করছেন না। কারণ সিলিন্ডারের বেশি দাম নিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে বিতর্কের জেরে অনেকেই পণ্যটি দোকানে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
চলতি মাসে বাজারে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষণা করা দাম ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। যা জানুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। তবে বাজারে চলতি মাসে কমিশন ঘোষিত দামের চেয়ে প্রতিটি সিলিন্ডার অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার জেনারেল স্টোরে (ছদ্মনাম) বেশ কয়েকটি কোম্পানির এলপি গ্যাস বিক্রি করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দোকানে পেট্রোম্যাক্সের ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। ফ্রেশ কিংবা ডেল্টা এলপি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। এছাড়া অন্য কোম্পানির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার দোকানটিতে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকা করে।
কেন বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন জানতে চাইলে এ বিক্রেতা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের চেয়ে সংকট কিছুটা কমেছে, কিন্তু দামে খুব বেশি পার্থক্য নেই। পরিবেশকদের কাছ থেকে আমরা কম দামে কিনতে পারছি না। আবার দাম কমিয়ে রাখতে বললে তারা সরবরাহ সংকটের দোহাই দেন। যেহেতু গ্রাহকের প্রয়োজন, সে কারণে দাম বেশি হলেও পণ্যটি দোকানে রাখতে হচ্ছে।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা আরমান হোসেন। প্রতি মাসে তার পরিবারের জন্য একটি করে গ্যাস সিলিন্ডার নেন স্থানীয় একটি দোকান থেকে। এ মাসে এলপিজি সিলিন্ডার কত দিয়ে কিনেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ মাসে এখনো কিনিনি। তবে দোকানদারকে ফোন দিয়েছিলাম এলপিজি আছে কিনা জানতে। দোকারদার জানিয়েছেন দাম ১ হাজার ৯০০ টাকা (প্রতি সিলিন্ডার)।’
আরমান হোসেন জানুয়ারিতে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছিলেন ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের কাছে জানা যায়, এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট আগের মতো নেই। তারা বলেন, সরবরাহ গত মাসের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। এ বাজারে দাম অন্য বাজারের তুলনায় সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা কম। কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন কোম্পানির গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। কারওয়ান বাজারের চা বিক্রেতারাও বলছেন, গত মাসে ২ হাজার টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনলেও এখন তা কিনছেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়।
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে এলপিজির সরবরাহ আগের চেয়ে বেড়েছে। এ মাসে (১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ৭৬ হাজার টন এলপিজি এসেছে। এ মাসে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আসবে। মার্চ থেকে বাজারে এলপিজির আর সংকট হবে না। তবে দাম হয়তো কিছুটা বাড়তি আছে। সরবরাহ বেড়ে গেলে দামও পর্যায়ক্রমে কমে আসবে।’
দেশে এলপি গ্যাসের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও পুনরায় এ বাজার ঊর্ধ্বমুখী ও সরবরাহ সংকট তৈরির শঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এরই মধ্যে ভূমধ্যসাগরে বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে তারা। ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়ে রেখেছে। তাই পুরো ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা শুরু হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়।
দেশের বাজারে এলপিজি আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। বিভিন্ন সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরের জলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে এলপিজি সরবরাহ করে। এ অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে যেকোনো সময় দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।









