মার্চের শুরুতে বাংলাদেশে প্রথম কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। সংক্রমণ প্রতিরোধে ২৬ মার্চ শুরু হয় দুই মাসের বেশি সময় স্থায়ী সাধারণ ছুটি। এ সময়ই ভাইরাসটি থেকে সুরক্ষা পেতে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন ওষুধ কিনে সংগ্রহেও রাখেন অনেকেই। এর প্রভাবে পরবর্তী ছয় মাসে দেশে ওষুধ বিক্রি ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএর তথ্যমতে, বিক্রয় প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় এ সময় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

ওষুধের বিক্রি ও ধরন নিয়ে নিয়মিত জরিপ চালায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য-প্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ। প্রতি প্রান্তিকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওষুধ বিক্রির তথ্য সংকলন ও পর্যালোচনা করে তারা। চলতি বছর জুন পর্যন্ত সংস্থাটির হিসাবে গত এক বছরে বাংলাদেশে স্থানীয় বাজারে ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। চলতি বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর—এ ছয় মাসে দেশে ১৩ হাজার ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ওষুধ বিক্রি হয়েছে। ২০১৯ সালের একই সময়ে ওষুধ বিক্রি হয় ১১ হাজার ৮৪১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার। এ হিসেবে করোনার ছয় মাসে ওষুধ বিক্রি বেড়েছে ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ।

ওষুধ উৎপাদকরা বলছেন, কভিডকালে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির কারণ প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন। যে প্রতিষ্ঠানগুলো কভিড সম্পর্কিত পণ্য উৎপাদন করে যেমন জ্বর, কাশি—এ ধরনের পণ্য যাদের ভালো ছিল, তারা ভালো করেছে। একইভাবে যে প্রতিষ্ঠানের এসব পণ্য কম, তাদের ব্যবসা ছিল গতানুগতিক বা তার কম। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসার বিষয়টিও প্রভাব ফেলেছে।

আইকিউভিআইএর পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট ওষুধ বিক্রির ৭০ শতাংশই করে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠান। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ওষুধ বিক্রয়কারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিক্রি প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের; সবচেয়ে কম ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের।

শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রীত ওষুধের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৫৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি প্রবৃদ্ধি ছিল বা বিক্রি বেশি হয়েছে ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ওষুধ হলো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রথমেই হলো স্বাস্থ্য। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তব্য হলো চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ উৎপাদন করা। উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশের চেয়ে ওষুধ উৎপাদনে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পটিতে উৎপাদিত পণ্যের উন্নত মানের পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হয়েছে। বেক্সিমকোও বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধ রফতানি করছে। করোনার যে মেডিসিনগুলো বেক্সিমকো উৎপাদন করে সেগুলো চিকিৎসক ও ভোক্তা পর্যায়ে ভালো সাড়া ফেলেছে বলেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ইনজেকশন থেকে শুরু করে আছে ট্যাবলেট-ক্যাপসুল। শুধু বিক্রি না সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ওষুধ বিতরণও করেছে বেক্সিমকো।

বিক্রি প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় শীর্ষ দশে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি হলো হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। আলোচ্য ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৮৪৩ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করেছে। ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় বিক্রয় প্রবৃদ্ধি বা বিক্রি বেশি হয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ।

ছয় মাসে ১৭ শতাংশের বেশি বিক্রয় প্রবৃদ্ধি হয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রীত ওষুধের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৭৫ কোটি ২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি।

জানতে চাইলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মার্কেটিং ডিরেক্টর আহমেদ কামরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, কভিডের মৌলিক ব্যবস্থাপনার যে বিষয় আছে স্কয়ার সেগুলো খুব দ্রুততার সঙ্গে শনাক্ত ও আয়ত্ত করতে পেরেছে। বিশ্বব্যাপী যখনই কোনো কিছুর অনুমোদন হয়েছে, আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে সেগুলো পিক করতে পেরেছি। আমাদের প্রস্তুতি ভালো থাকার কারণে উৎপাদন পর্যায়ে অপারেশনে যারা কাজ করত, তাদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক যারা আছে তারা খুব দ্রুতই বৈশ্বিক অনুমোদনের আলোকে বাংলাদেশে জেনেরিকগুলো তৈরির প্রস্তুতি নিতে পেরেছেন। তারপর সেই পণ্য যথাসময়ে বাজারে পৌঁছে দিতে পারার কারণেই স্কয়ারের এ প্রবৃদ্ধি। যারাই ভালো করেছে তারা মূলত প্রস্তুতি ভালো থাকার কারণে করেছে।

বিক্রয় প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় চতুর্থ অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি হলো এসকায়েফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। চলমান করোনাকালের প্রথম ছয় মাসে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত ওষুধের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫৭০ কোটি ১৭ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।

ওষুধ বিক্রি বেশি হয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানের প্রতিষ্ঠানটি হলো ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। চলতি বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ বিক্রি করেছে ১ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকার। বিক্রির পরিমাণ বিবেচনায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বিক্রয় প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা অপসোনিনের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সপ্তম অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠান এসিআইয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। অষ্টম অবস্থানের রেনাটার প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। নবম অবস্থানের অ্যারিস্টোফার্মার প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় দশম অবস্থানের প্রতিষ্ঠান ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের বিক্রি বেশি হয়েছে শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ।

ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের পারদর্শিতা তিনটি আঙ্গিকে বিবেচনা করা হয়। ব্যবস্থাপনা, পণ্য ও নীতি—এ তিন ক্ষেত্রে পারদর্শিতার সমন্বয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যেতে পারে তারাই বাজারে টিকে থাকে। কারিগরি দিকসম্পন্ন খাতটিতে টিকে থাকতে প্রয়োজন হয় কেন্দ্রীভূত মনোযোগ ও সহনশীলতার। কভিড প্রেক্ষাপটেও বাজার চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় রেখে ব্যবস্থাপনা, পণ্য ও নীতির সামঞ্জস্য করতে পেরেছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোরই বিক্রি প্রবৃদ্ধি ছিল বেশি। আর সামগ্রিকভাবে করোনা প্রেক্ষাপটই ওষুধের বিক্রি অনেকাংশে বাড়িয়েছে বলে মত প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।