গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেড় বছরে এসব অপারেটরের বিরুদ্ধে সেবার মান, ডেটা স্পিড ও মূল্য সংযোজন সেবাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১০ হাজার ২৬০টি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে জমা পড়ে।
প্রতি বছর এসব অভিযোগের অধিকাংশই নিষ্পত্তি হচ্ছে বলে বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হলেও একই বিষয়ে অভিযোগ জমা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই রয়েই যাচ্ছে গ্রাহক অসন্তোষ। অভিযোগ দিয়ে দীর্ঘ সময় অপারেটরদের দুয়ারে ঘুরেও সমাধান মিলছে না বলে জানিয়েছেন গ্রাহকরা।
বিটিআরসি থেকে পাওয়া তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, দেড় বছরে সর্বোচ্চসংখ্যক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে রবির বিরুদ্ধে। এ সময়ে এই অপারেটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ৩ হাজার ৯৩৬টি। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে এসেছে ৩ হাজার ২৫৪টি অভিযোগ। এছাড়া সরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫৮০টি এবং বাংলালিংকের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪৯০টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
এদিকে চলতি মাসে অপারেটরদের কোয়ালিটি অব সার্ভিস যাচাই করতে রংপুর শহরে ১০টি স্থানে মান পরীক্ষা করে বিটিআরসি। এতে ফোরজি ভয়েস কল সেবায় অপারেটরগুলো ন্যূনতম মানদণ্ড ছুঁতে পারেনি।
বিটিআরসির তথ্যমতে, দেড় বছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৪টি ক্যাটাগরিতে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছেন তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে। সেগুলো হলো সেবার মান (কোয়ালিটি অব সার্ভিস), অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্য সংযোজন সেবা চালু তথা ব্যালান্স থেকে টাকা কেটে নেয়া এবং ইন্টারনেটের কাঙ্ক্ষিত গতি না পাওয়া।
আগের বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জমা হওয়া ৫ হাজার ৪৪১টি অভিযোগের প্রায় অর্ধেক অভিযোগই এ তিন ক্যাটাগরিতে। সেবার মান নিয়ে ১ হাজার ৬৫৭টি, ইন্টারনেটের ধীরগতি নিয়ে ৫০৭টি এবং মূল্য সংযোজন সেবা নিয়ে ৪০৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এছাড়া গত দেড় বছরে রিচার্জ ও বিলিং, প্যাকেজ মাইগ্রেশন, মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি), ট্যারিফ সংক্রান্ত অভিযোগ, অননুমোদিত হ্যান্ডসেট তথ্য, সিম রেজিস্ট্রেশন, জালিয়াতি, সিমের মালিকানা, লাইসেন্স ইস্যু, কুইজ/পুরস্কার এবং এমএফএস/ব্যাংকিং সংক্রান্ত বিষয়েও গ্রাহকরা বিটিআরসিতে অভিযোগ দায়ের করে।
এমএনপি প্রক্রিয়ার জটিলতায় পড়ে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ব্যবহৃত নম্বর হারিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এক ভুক্তভোগী গ্রাহক মাকসুদুর রহমান (ছদ্মনাম)। বিটিআরসিতে দেয়া অভিযোগে তিনি জানান, তার ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বর মূল অপারেটর বাংলালিংক থেকে এমএনপির মাধ্যমে রবিতে রূপান্তর করেছিলেন। ১০টির বেশি সিম রেজিস্ট্রেশনের অজুহাতে নম্বরটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, নম্বরটি পুনরায় চালু বা সিম রিপ্লেসমেন্টের জন্য রবি গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা হলে তারা মূল অপারেটর বাংলালিংকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাংলালিংক ‘কাজ চলছে’ অজুহাতে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ ছয় মাস, তবুও সিমটি মেলেনি।
টেলিযোগাযোগ সেবার মানোন্নয়ন ও গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণে বিটিআরসি নিয়মিত গণশুনানির আয়োজন করে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ছয়টি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে প্রায় দেড় হাজার অভিযোগ জমা পড়ে। আগামী ১৯ আগস্ট-পরবর্তী গণশুনানি আয়োজনের সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি। এতে গ্রাহকদের অভিযোগ ও মতামতের ভিত্তিতে টেলিযোগাযোগ সেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে বিটিআরসি।
কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় গ্রাহকদের অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে বলে অভিযোগ ‘বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিটিআরসিতে আসা অভিযোগ বাস্তবতার তুলনায় ১ শতাংশও নয়। বিটিআরসির মূল দায়িত্ব জনগণ ও গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, শিল্পের স্বার্থ দেখা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু কমিশনের আগ্রহ মূলত রাজস্ব আহরণের দিকে বেশি। ফলে গ্রাহক ও শিল্প—দুই পক্ষের স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ চার অপারেটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেন পিছু ছাড়ছে না। অভিযোগের উল্লেখযোগ্য অংশ পেন্ডিং থাকতে দেখা যায়। সেবার মান ও ইন্টারনেট গতি নিয়ে প্রতিনিয়তই জমা হয় বেশির ভাগ অভিযোগ। বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে জমা হওয়া ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগের মধ্যে ১০ শতাংশ সমাধান হয়নি। এছাড়া সেবার মান নিয়ে অভিযোগ ৩ হাজার ৫২৯টি এবং ইন্টারনেট গতি নিয়ে অভিযোগ ৯২৬টি। এর আগের এক বছরে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৩০৫টির মধ্যে সমাধান হয়নি ২১ শতাংশ অভিযোগ। এ বছর সেবার মান নিয়ে ৪ হাজার ৫৭৯টি এবং ইন্টারনেট গতি নিয়ে ১ হাজার ১১টি অভিযোগ জমা পড়ে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৩৩৫টি অভিযোগ জমা পড়লেও সমাধান হয়নি ২৩ শতাংশ। এ বছরে সেবার মান নিয়ে ৫ হাজার ৮২২টি এবং ইন্টারনেট গতি নিয়ে ২ হাজার ৯২৪টি অভিযোগ জমা হয়েছে।
গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তা সমাধানের চেষ্টা করি। যেমন টাওয়ার বা নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব না হলে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরবর্তী করণীয় জানানো হয়। সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রদানে আমাদের নানা ধরনের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা নিরন্তর চলছে এবং চলবে।’
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, ‘বিটিআরসির মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো সর্বোচ্চ সততার সঙ্গে নির্ধারিত প্রক্রিয়া এবং সময়ের মধ্যেই সমাধান করা হয়। তবে নেটওয়ার্ক কাভারেজ-সংক্রান্ত সমস্যার মতো কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বা পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিক সমাধান সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের পেছনের কারণগুলো এবং সমস্যা সমাধানে নেয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে যথাসময়ে অবহিত করা হয়।’
রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, ‘বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশ এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে। গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিকে রবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। পাশাপাশি সেবার মান, ডেটা স্পিড ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে নিয়মিতভাবে নেটওয়ার্ক ও সেবা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। টেলিযোগাযোগ সেবা একটি জটিল প্রযুক্তিনির্ভর সেবা। এ সেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।’
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ দ্রুত সমাধানযোগ্য সেসব দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে। কিছু বিষয়ে সমাধানের জন্য সময় প্রয়োজন সেসব বিষয় সমাধানের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। কোয়ালিটি অব সার্ভিস-সংক্রান্ত অভিযোগই সবচেয়ে বেশি। সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশাও বাড়ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক যখন প্রথম চালু হয়, তখন কথা বলা গেলেই মানুষ সন্তুষ্ট ছিল। এখন এর সঙ্গে ইন্টারনেট, স্পিড ও অন্যান্য বিষয় যুক্ত হয়েছে। ফলে কোয়ালিটির প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমরা গত বছর কোয়ালিটি অব সার্ভিসের স্ট্যান্ডার্ড আপডেট করেছি। এসব স্ট্যান্ডার্ড কীভাবে পরিমাপ করা হবে, সেই মেজরমেন্টের নিয়মও সম্প্রতি নির্ধারণ করেছি। এ মাস থেকে প্রথমবারের মতো অপারেটরদের সার্ভিসের মান নিয়ে আমাদের ফাইন্ডিংস প্রকাশ করছি। এতে অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং মানুষও বুঝতে পারবে কারা ভালো বা খারাপ সেবা দিচ্ছে।’
অপারেটরগুলোর সাধারণ সমস্যা কলড্রপের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড মেনেও কল ড্রপ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।’










