হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করতে আরো ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও বকেয়া পরিশোধ করতে এ ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চতুর্থ একনেকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নথি সূত্রে জানা যায়, আগামী ১৬ ডিসেম্বর দেশের প্রধান এ বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) কাজ শেষ হয়েছে ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এবার তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়াল ২২ হাজার ২১৩ কোটি ১০ লাখ টাকায়।

রক্ষণাবেক্ষণ ও বকেয়া পরিশোধ করতে গিয়ে প্রকল্পটির বরাদ্দ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। একনেক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টার্মিনালটি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মী ও পরামর্শকদের ৩০ মাসের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পরিশোধ করতে হবে। টার্মিনালটি আগামী ১৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। এ লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ এগিয়ে নিতে হলে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বকেয়া অর্থও পরিশোধ করতে হবে। সংশোধিত প্রকল্পে সে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ঠিকাদারি চুক্তির পরিবর্তনের কারণে আরো ২৯৪ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্পের যেসব কাজ এখনো বাকি, সেগুলো সম্পন্ন করার জন্য অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিআইপি সুবিধাসংক্রান্ত কাজ, কার্গো হ্যান্ডলিং সিস্টেমের পারফরম্যান্স টেস্টিং, তৃতীয় টার্মিনালের ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেমের পরীক্ষা, ওয়াটার ও স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের পরীক্ষা এবং এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেমের (ইডিএস) জন্য ইউপিএস সরবরাহের কাজ। এছাড়া পরামর্শক নিয়োগের বিষয়ও রয়েছে।’

প্রকল্পে ব্যয় পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রী জোর দিচ্ছেন জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত পরামর্শক ব্যয় পর্যালোচনা করে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন প্রকল্পের মেয়াদ যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাড়ানো যাবে না। যথাযথ কারণ ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলে বিলম্বের জন্য দায়ী কর্মকর্তা ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।’

এ প্রকল্পসহ গতকাল একনেক সভায় মোট ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প আটটি ও সংশোধিত প্রকল্প তিনটি এবং দুটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ১১৮ কোটি এবং প্রকল্প ঋণ ৫ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৩৮২ কোটি টাকা।

একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম রেসপন্স টু ফাইট অ্যাগেইনস্ট টিবি, এইচআইভি অ্যান্ড ম্যালেরিয়া ইন বাংলাদেশ ও পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প; অর্থ মন্ত্রণালয়ের"ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২ প্রকল্প; সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে বিদ্যমান শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিষ্ঠান রৌফাবাদ চট্টগ্রামে হোস্টেল ভবন সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা" প্রকল্প; পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণসহ ছোট ফেনী এবং বামনী নদী অববাহিকায় সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (অংশ-১)"প্রকল্প ও মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলাধীন শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষা প্রকল্প।

এছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা ও দুটি গ্রামীণ উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্থাপন প্রকল্প; স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের রংপুর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা এবং ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প এবং মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের র‍্যাবের (এসআরবি) কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ফেনী জেলার সোনাগাজীতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ"এবং তিনটি পার্বত্য জেলায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।

এছাড়া এরই মধ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সংবলিত ১৫টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় অবহিত করা হয়।

একনেক সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; মহিলা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন; ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু; শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন; সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা।